সন্দীপ সরকার, কলকাতা: ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ইনিংস তখন সবে শেষ হয়েছে। গ্যালারিতে চর্চায় শুধু একের পর এক নেতিবাচক পরিসংখ্যান।
১৩। এই টি-২০ বিশ্বকাপে যতগুলি ক্যাচ ফেলেছেন ভারতীয় ক্রিকেটারেরা। ফিল্ডিং কোচ টি দিলীপকে তো পারলে শূলে চড়িয়ে দেয় ক্ষুব্ধ ক্রিকেটপ্রেমীরা।
১৫৮। ইডেন গার্ডেন্সে আন্তর্জাতিক টি-২০ ম্যাচে সর্বোচ্চ যে স্কোর তাড়া করে ম্যাচ জেতার নজির রয়েছে কোনও দলের। ২০২২ সালে। ভারতই জিতেছিল সেই ম্যাচে। প্রতিপক্ষের নাম? ওয়েস্ট ইন্ডিজ়। সেখানে রবিবার মরণ-বাঁচন ম্যাচে জিততে কি না ১৯৬ রানের পাহাড় পেরতে হবে!
সবার ওপরে ছিল আরও এক ধ্রুব সত্য। টি-২০ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ইডেনে অপরাজিত। কখনও হারেনি। ২০১৬ সালে এই মাঠেই ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টি-২০ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ক্যারিবিয়ানরা। বেন স্টোকসের শেষ ওভারে চার বলে চার ছক্কা মেরে কার্লোস ব্র্যাথওয়েটের সেই মায়াবী রাত উপহার ক্রিকেটপ্রেমীদের। এবারের টি-২০ বিশ্বকাপেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ় যে দু’ম্যাচ খেলেছে ইডেনে, দুটিতেই জয়।
সঞ্জু স্যামসন যখন ইনিংসের বিরতিতে প্যাড বেঁধে, হেলমেট পরে তৈরি হচ্ছিলেন, তার মাথাতেও কি ছিল এইসব তথ্য? না হলে ব্যাটের চাবুকে সব পরিসংখ্যান, রেকর্ডবুককে এভাবে ফালাফালা করে দিলেন কীভাবে! কেরলের ক্রিকেটারের ডাকাবুকো ইনিংস সঞ্জীবনী দিল ভারতকে। ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়কে ৫ উইকেটে হারিয়ে টি-২০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের টিকিট পাকা করে ফেলল ভারত। ৫ মার্চ, বৃহস্পতিবার ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ভারত।
ভারতের জয়ে নায়ক সঞ্জু। কেরলকে বলা হয় গডস ওন কান্ট্রি। ঈশ্বরের নিজের দেশ। সেই কেরলের ক্রিকেটার সঞ্জু বরাবর ভারতীয় ক্রিকেটে সূতপুত্র হয়েই থেকেছেন। কর্ণের মতো। আন্তর্জাতিক টি-২০ ক্রিকেটে এক বছরে জোড়া সেঞ্চুরি করবেন। কিন্তু অর্জুন হওয়া তাঁর ভাগ্যে থাকবে না। যাবতীয় মাতামাতি তোলা থাকবে অভিষেক শর্মাদের জন্য।
এই বিশ্বকাপের আগেই একাদশে জায়গা হারিয়েছিলেন। ধারাবাহিকতার অভাব ছিল। কিন্তু দল থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার মতো কি? কিন্তু ক্রিকেট অনেকটা সমুদ্রের মতো। যেমন কেড়ে নেয়, ফিরিয়েও দেয়। অভিষেক শর্মার শূন্যের হ্যাটট্রিক ফের দরজা খুলে দিয়েছিল কেরলের ক্রিকেটারের জন্য। জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে সুপার এইটের ম্যাচে দলে ফিরে বড় রান পাননি। তবে ১৫ বলে ২৪ রান করে জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন।
জ্বলে ওঠার মঞ্চ হিসাবে সঞ্জু বেছে নিলেন ইডেনকে। যে রাতে অভিষেক শর্মা জোড়া ক্যাচ ফেললেন, ব্যাট হাতেও ১১ বলে ১০ রানের হতাশা উপহার দিলেন, সেই রাতেই দেশকে সেমিফাইনালের টিকিট উপহার দিলেন সঞ্জু। ৫০ বলে ৯৭ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিত রইলেন সঞ্জু। রোমারিও শেফার্ডের বল মিড অনের ওপর দিয়ে বাউন্ডারিতে পাঠিয়েই হেলমেট খুলে হাঁটু গেড়ে পিচের ওপর বসে পড়লেন দিনের নায়ক। আকাশের দিকে দুহাত তুলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালেন।
চার বল বাকি থাকতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের রান তাড়া করে জিতে ইডেনে নতুন নজির গড়ল ভারত। পৌঁছে গেল শেষ চারে। যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে ইংল্যান্ড। এর আগে কোনও দেশ পরপর দুবার টি-২০ বিশ্বকাপ জেতেনি। সেই স্বপ্ন এখনও বেঁচে। ভারতের মুকুটরক্ষার স্বপ্ন ইডেন থেকেই আরও রঙিন হল।
