নয়াদিল্লি: আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথ হানায় নিহত আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। পশ্চিম এশিয়া জুড়ে নেমে এসেছে যুদ্ধেরক আশঙ্কা। সেই অবস্থায় সব পক্ষকে সংযম বজায় রাখার আবেদন জানালেও, খামেনেইয়ের মৃত্যু নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি ভারত। সেই আবহে ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কের কথা উঠে আসছে বার বার। অতীতে বার বার যেভাবে ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে ইরান, কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারকে সেকথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গাঁধীও। (India-Iran Relations)
ইরানের সঙ্গে বরাবরই সুসম্পর্ক ছিল ভারতের। নয়ের দশকে কাশ্মীর ইস্যুতে যখন কার্যত কোণঠাসা অবস্থা, সেই সময় বন্ধু হিসেবে ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল ইরানই। সই সময়, সবে ধসে যাওয়ার মুখ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ভারতের অর্থনীতি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে খান খান হয়ে যাওয়ার পর রাশিয়ার অবস্থাও নড়বড়ে। এমন পরিস্থিতিতে কাশ্মীর নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের বিরু্দ্ধে প্রস্তাব পেশ করে পাকিস্তান। কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। (Ayatollah Ali Khamenei)
সেই নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার পরিষদে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব জমা দিতে উদ্যগত হয় অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন-এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলি। ওই প্রস্তাবে সমর্থন ছিল একাধিক পশ্চিমি দেশেরও। ফলে ভারতের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সেই পরিস্থিতিতে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও ইরানকে পাশে পেতে সচেষ্ট হন। সেই মতো তদানীন্তন বিদেশমন্ত্রী দীনেশ সিংহকে তেহরান পাঠানো হয়। অসুস্থ শরীরে, হুইলচেয়ারে বসে তেহরান পৌঁছন দীনেশ। সেখানে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত হন ইরানের তদানীন্তন বিদেশমন্ত্রী আকবর বিলায়তি। দীনেশের হাত ধরে জানতে চান, এমন কী হল, যাতে হুইলচেয়ারে বন্দি অবস্থাতয় এতদূর ছুটে আসতে হল। জবাবে, ভারতের কূটনৈতিক আবেদন তাঁর হাতে তুলে দেন দীনেশ। আর তাতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের আনা ওই প্রস্তাবে সমর্থন জানায়নি ইরান। কাশ্মীর ইস্যুতে রাষ্ট্রপুঞ্জের হস্তক্ষেপের যে স্বপ্ন দেখছিল পাকিস্তান, তা খান খান হয়ে যায়। ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কেও প্রভাব পড়ে।
গোড়ার দিকে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলত ইরান। এমনকি মহম্মদ রেজা পেহলভির আমলে ইরান ঘোষিত ভাবেই পাকিস্তানকে সমর্থন করত। কিন্তু রাজতন্ত্রের অবসান ঘটলে, রুহোল্লা খোমেইনির শাসন চালু হলে নিজেদের বিদেশনীতিতে বদল ঘটায় ইরান। খোমেইনির দাদু আহমেদ হিন্দের জন্ম ভারতের উত্তরপ্রদেশে। ভারত সংযোগের কথা বার বার শোনা গিয়েছে খোমেইনির মুখে। তাঁর শাসন কায়েম হওয়ার পর, পাকিস্তানের পরিবর্তে ভারতকে সমর্থন জানাতে শুরু করে ইরান। কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে বিপদ দেখা দিলেও ভারতের পাশে দাঁড়ায় তারা। পরবর্তীতেও একাধিক ইস্যুতে ভারতের পাশে থেকেছে ইরান। পাকিস্তানকে টপকে পশ্চিম এশিয়া এবং ইউরোপের সঙ্গে যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারে ভারত, তার জন্য চবাহার বন্দরও ভারতের হাতে তুলে দেয় তারা। দীর্ঘ সময় ধরে ভারতকে সস্তায় তেলও জুগিয়ে গিয়েছে ইরান। তবে মোদি সরকার যখন জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য সংরক্ষিত অনুচ্ছেদ ৩৭০ খর্ব করে, সেই সময় সমালোচনায় সরব হন খামেনেই। লেখেন, ‘কাশ্মীরে মুসলিমদের অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন আমরা। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। কিন্তু মুসলিমদের উপর শোষণ যাতে বন্ধ হয়, তেমন নীতি প্রণয়ন করতে হবে ওদের’।
আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের হামলায় খামেনেইয়ের মৃত্যুতে ভারতেও প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চোখে পড়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর ছাড়াও ভারতের একাধিক রাজ্যে খামেনেই-হত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষজন। কেন্দ্রীয় সরকার যদিও খামেনেইয়ের মৃত্যু নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও মন্তব্য করেনি। সেই নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে তারা। কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রকে।
