নয়াদিল্লি: পশ্চিম এশিয়া জুড়ে যুদ্ধের পরিস্থিতি। সেই আবহে ভারতে বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস। আমেরিকার বাসিন্দা, এক ভাড়াটে যোদ্ধাকে গ্রেফতার করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা NIA. গ্রেফতার করা হয়েছে ইউক্রেনের ছয় নাগরিককেও। মিজোরাম হয়ে মায়ানমারে ঢোকার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। মায়ানমারে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে তারা যুদ্ধের কলা-কৌশল শেখাতে, অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতে যাচ্ছিল বলে জানা যাচ্ছে। (Matthew VanDyke)
বিগত কয়েক মাস ধরে নজরদারি চালিয়ে ওই সাতজনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে বলে খবর। ধৃতদের আমেরিকার নাগরিক ম্যাথু অ্যারন ভ্যান ডাইক, ইউক্রেনের নারিক হারবা পেত্রো, স্লাইভিয়াক টারাস, ইভান সুকমানোভস্কি, স্টেফানকিভ মারিয়ান, হানচারুক মাকসিম এবং কামিনস্কি ভিক্টর বলে শনাক্ত করা গিয়েছে। ধৃতদের ডিজিটাল গতিবিধি পরখ করে দেখছে NIA. ধৃতদের নেটওয়র্কে অন্য সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার চেষ্টাও চলছে। (NIA Probe)
NIA সূত্রে খবর, গত ১৩ মার্চ ধৃত ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিকদের মধ্যে তিন জনকে দিল্লির ইন্দিরা গাঁধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়। অন্য তিনজনকে গ্রেফতার করা হয় লখনউয়ের চৌধরি চরম সিংহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে। অন্য দিকে, আমেরিকার নাগরিক ভ্যানকে গ্রেফতার করা হয় কলকাতা বিমানবন্দর থেকে। এক রাতেই গ্রেফতার করা হয় সাতজনকে।
ভ্যানের নামে খোলা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টটিতে তার পরিচয় ‘মিডিয়া ব্যক্তিত্ব’। ইউক্রেনে বাস করে বলে লেখা রয়েছে। সোশ্য়াল মিডিয়া পোস্টে বিভিন্ন দেশে সরকার বদলের গোপন অভিযানে যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছে সে। ভেনিজ়ুয়েলার উল্লেখও রয়েছে। ভ্যান লেখে, ‘ভেনিজ়ুয়েলা, বর্মা (মায়ানমার), ইরান এবং অন্য স্বৈরাচারী শাসকদের বলব, আমরা আসছি। রাশিয়া, তোমাদের উৎখাত করতেও আসছি আমরা’।
কয়েক মাস আগে করা একটি পোস্টে ভ্য়ান জানায়, যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে সে। ইলন মাস্কের ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা Starlink ব্য়বহারের উল্লেখও ছিল। ইরাকে যুদ্ধেও অংশ নেয় সে। বিষয়টি তাদের নজরে পড়েছে বলে জানিয়েছে ভারতে আমেরিকার দূতাবাসের মুখপাত্র। তবে আমেরিকার নাগরিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। গোপনীয়তা রক্ষার প্রয়োজন তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ইউক্রেনের তরফে ছয় নাগরিককে গ্রেফতারের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। দিল্লিতে মোতায়েন ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত, অলেকজ়ান্ডার পলিসচুক বিদেশমন্ত্রকের সচিব সিবি জর্জের সঙ্গে দেখা করেন। প্রতিবাদপত্র তুলে দেন হাতে। দেশের নাগরিকদের আিনি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেন। কিভের দাবি, ওই ছয়জন ভারত বা মায়ানমারের মাটিতে কোনও বেআইনি কাজে লিপ্ত বলে প্রমাণ মেলেনি। তবে উত্তর-পূর্ব ভারতে, ‘রেস্ট্রিক্টেড জোনে’ তাদের উপস্থিতি অনিচ্ছাকৃত বলেও দাবি করেছে ইউক্রেন।
ধৃত ওই সাত জনের বিরুদ্ধে UAPA ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার পটিয়ালা হাউস কোর্টে পেশ করা হয় তাদের। আপাতত ১১ দিনের NIA হেফাজত হয়েছে। সেখানে ধৃত ইউক্রেনীয় নাগরিকদের হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী অঙ্কপর সায়গল এবং প্রমোদ কুমার দুবে। তাঁরা জানান, এখনও পর্যন্ত এফআইআর-এর কপি হাতে পাননি।
NIA সূত্রে খবর, পর্যটক হিসেবে ভিসা নিয়ে ভারতে এসেছিল ধৃতরা। পরবর্তীতে মিজোরাম পৌঁছয়। কোনও রকম অনুমতি না নিয়েই ‘রেস্ট্রিক্টেড জোনে’ প্রবেশ করে এবং সীমান্ত পেরিয়ে মায়ানমারে ঢোকে। ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মায়ানমার থেকে মিজোরাম হয়ে ঢোকানোর পরিকল্পনা ছিল বলেও জানা গিয়েছে। এমনকি তারা মায়ানমারে ড্রোনও পাচার করেছিল বলে খবর।
তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা যাচ্ছে, মায়ানমারে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীগুলিকে প্রশিক্ষণ দিতে গিয়েছিল ধৃতরা। গেরিয়া যুদ্ধ, কৌশলী অভিযান, আধুনিক যুদ্ধকৌশল এবং ড্রোন ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে।
ধৃতদের মধ্যে ভ্যানকে নিয়ে এই মুহূর্তে চর্চা বেশি। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় সেখানেই ছিল সে। মোটরসাইকেলে চেপে উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়া চষে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। লিবিয়ায় বিদ্রোহী যোদ্ধাদের দলে যোগ দেয় সে। সেখানে ছ’মাস জেলও খেটেছে। ২০১১ সালে যুদ্ধ শেষ হলে, জেলপালিয়ে আমেরিকায় ফিরে যেতে সফল হয়। এর পর সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধে শুরু হলে, তথ্য়চিত্র বানানোর অজুহাতে সেখানেও পৌঁছে যায় ভ্য়ান। ISIS-এর হাতে সেখানে দুই সাংবাদিক বন্ধু জেমস ফোলি এবং স্টিভেন সটলঅফকে হারায় ভ্যান। তাতেই পরিকল্পনা বদলে ফেলে সে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে। Sons of Liberty International নামের একটি সংগঠনও তৈরি করে ভ্য়ান, যারা ভিন্ন ভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে পরামর্শ দিত।
তদন্তে নেমে বেশ কিছু অডিও রেকর্ডিং হাতে পেয়েছেন তদন্তকারীরা। সেখানে বিভিন্ন দেশে বিদ্রোগী সংগঠনগুলিকে সমর্থন জোগানোর কথা স্বীকার করতে শোনা গিয়েছে তাকে। তার দাবি, বিদেশি যোদ্ধাদের বিদ্রোহে লিপ্ত করা তার উদ্দেশ্য় নয়। বরং স্থানীয় মানুষজনরকে বিদ্রোহের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করাই লক্ষ্য তার। ভেনিজ়ুয়েলা, মায়ানমার এবং ইরানে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতে ভাড়াটে সৈনিকদের আহ্বানও জানায় সে।
ভ্য়ানের গ্রেফতারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতে সশস্ত্র উগ্রপন্থী সংগঠনগুলির যে বাড়বাড়ন্ত, তাতে তার সংযোগ পাওয়া গিয়েছে। উগ্রপন্থীদেরও সে ড্রোনের মাধ্যমে হামলা চালানো, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল বলে অভিযোগ। একই সঙ্গে ভ্য়ানের গ্রেফতারি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। ভ্যান চরবৃত্তিতে লিপ্ত ছিল কি না, তথ্য পাচার করছিল কি না, ভারতবিরোধী, নিষিদ্ধ গোষ্ঠীগুলিকে মদত জোগাচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
