নয়াদিল্লি: ভেনিজুয়েলার তেলের উপর আমেরিকার কর্তৃত্ব থাকবে বলে আগেই ঘোষণা করেছিলেন। এবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানালেন, আমেরিকার হাতে ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল তুলে দেবে ভেনিজুয়েলা। বাজারের দামেই ওই তেল কিনবে আমেরিকা। তবে এই গোটা প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করবে আমেরিকাই। ভেনিজুয়েলা এবং আমেরিকা, দুই দেশের সধারণ মানুষই যাতে এতে লাভবান হন, তা আমেরিকা দেখবে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। শুধু তাই নয়, ভেনিজুয়েলাকে চিন, রাশিয়া, ইরান ও কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে, তাদের দেশ থেকে তাড়াতে হবে বলেও নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। সেই মর্মে ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ়কে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছেন, যার পর আরও তেল উত্তোলন করা সম্ভব হবে। ট্রাম্প সরকার পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, তৈল উৎপাদন সংক্রান্ত বিষয়ে একমাত্র আমেরিকার সঙ্গেই সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে ভেনিজুয়েলা। ভারী অশোধিত তেল বিক্রির সময় আমেরিকাকে বাড়তি সুবিধাও দিতে হবে তাদের। ( US vs Venezuela)
এনার্জি সেক্রেটারি ক্রিস রাইটকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। জাহাজে করে ভেনিজুয়েলা থেকে আমেরিকায় তেল ঢুকবে। সরাসরি আমেরিকার বন্দরেই নামানো হবে সেগুলিকে। হোয়াইট হাউসের এক আধিকারিককে উদ্ধৃত করে CNN জানিয়েছে, তেল রাখাই আছে, ব্যারেলে ভরাও হয়ে গিয়েছে। এর অধিকাংশ উপসাগরে আমেরিকার শোধনাগারে যাবে। (United States to Venezuela)
৩ এবং ৫ কোটি ব্যারেল তেল অনেক মনে হলেও, আমেরিকায় প্রতিদিনই ২ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল খরচ হয়। ভেনিজুয়েলা থেকে তেল পেলে, আমেরিকার বাজারে তেলের দাম কমতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষের খরচ বাঁচবে। তবে গ্যাসের দামে কোনও ফারাক নাও পড়তে পারে আপাতত। ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, ২০২২ সালে আমেরিকার তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন US Strategic Petroleum Reserve থেকে ১৮ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছিলেন, যাতে চার মাসের মধ্যে গ্যাসের দাম কমেছিল ১৩ থেকে ৩১ সেন্ট।
তবে এদিন ভেনিজুয়েলা থেকে তেল আসার খবর যেই না ঘোষণা করেন ট্রাম্প, সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকার বাজারে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১ ডলার কমে যায়। ৫ কোটি তেল বিক্রি ভেনিজুয়েলার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ৫৫ ডলার প্রতি ব্যারেল দলে তেল বিক্রি করে তারা। তাই আমেরিকা বাজারমূল্যে তেল কিনতে আগ্রহী গ্রাহক খুঁজে আনতে পারলে, তারা ১.৬৫ থেকে ২.৭৫ বিলিয়ন ডলার আয়ক রতে পারে।
গত বছর আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পর ভেনিজুয়েলা বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল মজুত করেছে। কিন্তু মজুত রাখা সেই তেল আমেরিকার হাতে তুলে দিলে ভেনিজুয়েলার নিজের জন্য রাখা রসদ ফুরিয়ে যেতে পারে।
গত বছরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র তেল নিষেধাজ্ঞা শুরু করার পর থেকে ভেনিজুয়েলা অপরিশোধিত তেলের বিশাল মজুদ গড়ে তুলেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে এত বিপুল পরিমাণ তেল হস্তান্তর করলে ভেনিজুয়েলার নিজস্ব তেলের মজুদ ফুরিয়ে যেতে পারে। Price Futures Group-এর ফিল ফ্লাইনের মতে, ভেনিজুয়েলার মজুত করে রাখা তেল আমেরিকায় ঢুকছে, আবার তাদের যে ট্য়াঙ্কার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছেল, তেল ঢুকছে সেখান থেকেও। ট্যাঙ্কারগুলিতে চাপিয়ে ১.৫ থেকে ২.২ কোটি ব্যারেল তেল নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
কতদিনের মধ্যে ওই পরিমাণ তেল আমেরিকার হাতে তুলে দেবে ভেনিজুয়েলা, তা এখনও স্পষ্ট ভাবে জানা যায়নি। তবে দ্রুতই গোটা বিষয়টি সেরে ফেলতে হবে। কারণ ভেনিজুয়েলার তেল অত্যন্ত ভারী ও ঘন। বেশি দিন ফেলে রাখা যায় না। ভেনিজুয়েলার তেল নিয়ে ওভাল অফিসে বৈঠকও রয়েছে শুক্রবার। সেখানে তেল সংস্থা Exxon, Chevron, ConocoPhillips-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি। তার আগে ভেনিজুয়েলাকে পরিষ্কার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, আমেরিকার শর্তপূরণ করতে পারলে তবেই আরও তেল উত্তোলনের অনুমতি পাবে তারা। চিন, রাশিয়া, কিউবা, ইরানকে বের করে দিতে হবে ভেনিজুয়েলাকে। তাদের সঙ্গে সমস্ত অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, শুধুমাত্র আমেরিকার সঙ্গেই জোট বাঁধতে হবে ভেনিজুয়েলাকে। এতদিন চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল ভেনিজুয়েলারের। তারাই ভেনিজুয়েলার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি তেল কিনত।
চাপসৃষ্টি করেই আমেরিকা ভেনিজুয়েলাকে নিজের কথা মতো চলতে বাধ্য করছে বলে খবর। দেশের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও সেনেটরদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তেলের ট্যাঙ্কারগুলি যেহেতু ভর্তি, তাই ভেনিজুয়েলাকে চাপের সামনে মাথানত করতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
Bllomberg-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে তেলের কুয়োগুলি বন্ধ করতে শুরু করে ভেনিজুয়েলা। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার জেরে তেল উত্তোলন করা হলেও, তা মজুত করে রাখার জায়গা কম পড়ছিল। আমেরিকার শর্ত না মানলে, আরও কুয়ো বন্ধ করে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ভেনিজুয়েলার অর্থনীতিও আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না, আবার প্রশ্নের মুখে পড়বে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথগ্রহণ করা ডেলসির শাসনক্ষমতাও। আমেরিকার অনুমান, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মজুত রাখা তেল বিক্রি করতে না পারলে দেউলিয়া হয়ে যাবে ভেনিজুয়েলা। আমেরিকার সেনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার জানিয়েছেন, আমেরিকা ভেনিজুয়েলার তৈলভাণ্ডারকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এর জন্য সেখানে সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই। তেল নিয়ে জাহাজ, ট্য়াঙ্কারগুলিকে হাভানা যেতে দেওয়া হবে না।
