নয়াদিল্লি: জোঁকের মতো যখন চারিদিক থেকে ছেঁকে ধরছে পশ্চিমি শক্তিগুলি, সেই সময় গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছিলেন সৌদি আরবের প্রাক্তন তৈলমন্ত্রী আহমেদ জ়াকি ইয়েমনি। খানিকটা স্বগতোক্তির মতোই, হতাশা মেশানো সুরে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল ‘আরবের একটাই অপরাধ, তাদের কাছে তেল রয়েছে’। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই উক্তি এখন কানে বাজছে ভেনিজুয়েলারও। সৌদির মতো বাণিজ্যিকীকরণ না ঘটলেও, দেশে মজুত তৈলভাণ্ডার এবং খনিজ সম্পদ এখন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদেরও। কিন্তু বর্তমানে সৌদি ও ভেনিজুয়েলার অবস্থায় আকাশপাতাল ফারাক। শনিবার সেখানে হামলা চালায় আমেরিকা। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করে নিয়ে যায়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও এই পদক্ষেপের কারণ হিসেবে মাদকচক্র, বেআইনি অভিবাসন-সহ একাধিক কার্যকারণ তুলে ধরেছেন। কিন্তু ভেনিজুয়েলায় মজুত খনিজ তেলের বিপুল ভাণ্ডার এবং খনিজ সম্পদের উপর যে তাঁর নজর, তাও স্পষ্ট বোঝা গিয়েছে। আর তাতেই ভেনিজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে কৌতূহল দেখা দিয়েছে পৃথিবীর সর্বত্র। (US Attacks Venezuela)
ভেনিজুয়েলায় খনিজ সম্পদে প্রাচুর্য কেন?
রেকর্ড বলছে, পৃথিবীতে মজুত যত তৈলভাণ্ডারের হদিশ মিলেছে এখনও পর্যন্ত, তার মধ্যে ভেনিজুয়েলায় মজুত তৈলভাণ্ডারই বৃহত্তম। সেখানে মাটির নীচে মজুত রয়েছে বিপুল পরিমাণ সোনাও। পাশাপাশি, বহু বিরল প্রকারের খনিজও পাওয়া যায়। ভৌগলিক অবস্থানের জন্যই প্রাকৃতিক সম্পদের এই প্রাচুর্যতা ভেনিজুয়েলায়। পশ্চিমে আন্দিজ় পর্বতমালা থেকে পূর্বে অরিনোকো নদী অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তৃত ভেনিজুয়েলা,, যা লাতিন আমেরিকার অন্যতম দীর্ঘতম নদী। দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে গায়ানা শিল্ড। অরিনোকো অববাহিকার দক্ষিণ থেকে পূর্বে ৫৫ হাজার বর্গ কিলোমিটারের যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল, সেটি অরিনোকো বেল্ট নামেও পরিচিত। এই অরিনোকো বেল্টের নীচে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি ব্যারেল অতি-ভারী, অশোধিত তেলের বিরাট ভাণ্ডার রয়েছে।পৃথিবীর আর কোথাও এমন নজির নেই। আবার দক্ষিণে যে বনভূমি অধ্যুষিত সমতল ও বন্ধুর পার্বত্য অঞ্চল রয়েছে, তা সোনা উত্তোলনের জন্য আদর্শ। (Venezuela Natural Resources)
কত তেল মজুত ভেনিজুয়েলায়?
অরিনোকো বেল্টের নীচে আবার মায়োসিন যুগের পাললিক শিলাস্তর রয়েছে। পলির চাপ ও চাপের ফলে ওই শিলাস্তর থেকেও উৎপন্ন হয়েছে ভারী তেল। US Geological Survey-র রেকর্ড অনুযায়ী, সেখানে মজুত ১ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি ব্যারেল তেলের মধ্যে ৩৮ হাজার কোটি থেকে ৬৫ হাজার ২০০ কোটি ব্যারেল তেল উত্তোলনযোগ্য। ওই বিপুল পরিমাণ তেল বেলেপাথরের ভাণ্ডারে আটকে পড়ে রয়েছে। এই তেল গাঢ়, চটচটে। ওই তেল উত্তোলন করতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য় প্রয়োজন। তাই সবমিলিয়ে মজুত তৈলভাণ্ডারের নিরিখে সৌদি আরবের চেয়েও এগিয়ে ভেনিজুয়েলা।
কত সোনা মজুত রয়েছে ভেনিজুয়েলায়?
গায়ানা শিল্ডে Archean Imataca Complex gneisses এবং Proterozoic greenstone belt রয়েছে, যেখানে সোনা মজুত রয়েছে। সবমিলিয়ে উত্তোলনযোগ্য প্রায় ১০ হাজার টন সোনা রয়েছে সেখানে। মেটাভলক্যানিক এবং মেটাসেডিমেন্ট শিলাস্তরে ২০০টিরও বেশি সোনার খনির সন্ধান মিলেছে এখনও পর্যন্ত, যেখানে উত্তোলনযোগ্য ৮ হাজার মেট্রিক টন সোনা লুকিয়ে রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বলিভারে ‘চোকো ১০’-এর মতো অঞ্চল রয়েছে, সেখানেও মজুত রয়েছে প্রচুর সোনা।
প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার
ভেনিজুয়েলায় মাটির নীচে ২০০ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার রয়েছে, যাতে এখনও হাতই পড়েনি। পাইপলাইন, LNG পরিষেবা এবং বিদেশি বিনিয়োগ না থাকায়, ওই প্রাকৃতিক গ্যাস ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের কাছে ভেনিজুয়েলা তাই সরবরাহের সুপ্ত উৎসহ। বর্তমানে যা পরিস্থিতি, এখনই সেখান থেকে গোটা পৃথিবীতে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
ভেনিজুয়েলার মাটিতে প্রচুর বিরল প্রকৃতির খনিজ সম্পদও মজুত রয়েছে। লৌহ আকরিক, বক্সাইট, নিকেল, তামা, জিঙ্কও রয়েছে বিপুল পরিমাণ।
সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কেন অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে?
কিন্তু উন্নত পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তির অভাবে ওই বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের বাণিজ্যিকীকরণ ঘটেনি। এর জন্য দেশের সরকারকেই দায়ী করে আমেরিকার মতো তাবড় শক্তিধর দেশগুলি। তাদের দাবি, বিদেশি সংস্থাগুলির বিনিয়োগ করার উপায়ই নেই। কারণ খননকার্যের অনুমতি দিতেই চায় না ভেনিজুয়েলা সরকার। কথাবার্তা এগিয়েও মাঝপথে অনুমতি বাতিল হয়ে যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে। উন্নত পরিকাঠামো, পরিবহণ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংযোগ পর্যন্ত নেই। মালিকানা, করব্যবস্থা, মুনাফা সংক্রান্ত নীতি নিয়ম কখন যে বদলে যায়, আগে থেকে কিছু বোঝা যায় না। এর ফলে বিরল খনিজের জন্য হাতেগোনা কিছু দেশের উপরই নির্ভর করে থাকতে হয়। এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ৭০ শতাংশই সরবরাহ হয় চিন থেকে।
ভেনিজুয়েলা বনাম আমেরিকা
ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও একরকম কোণঠাসা ভেনিজুয়েলা। আমেরিকা এবং তাদের সহযোগী দেশগুলি কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে তাদের উপর। ফলে সেখানকার বাজার নাগালের বাইরেই রয়ে গিয়েছে। প্রযুক্তি হোক বা বিমা, অথবা সরাসরি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাহসে কুলিয়ে ওঠে না। একসময় পণ্য় রফতানি করে যত আয় করত ভেনিজুয়েলা, তাতে ৭০ শতাংশ যোগদান ছিল শুধুমাত্র তেলের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিকাঠামোও ধসে গিয়েছে, ধসে গিয়েছে দেশের অর্থনীতিও। ঘুরে দাঁড়ানোর কোনও লক্ষণও নেই।
এমন পরিস্থিতিতে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গোপন রাখেননি ট্রাম্পও। মাদুরোকে বন্দি করেই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকাই ভেনিজুয়েলা চালাবে। আমেরিকার কর্তৃত্ব কায়েম থাকবে সেখানকার তৈলভাণ্ডারের উপরও। তাই কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শনিবার ভোরে ভেনিজুয়েলার উপর যে হামলা চালানো হয়, তা যত না মাদকচক্র, বেআইনিঅভিবাসন সংক্রান্ত কার্যকারণের দরুণ, তার চেয়ে অনেক বেশি সেখানকার সম্পদ কুক্ষিগত করার লক্ষ্যেই সম্পাদিত হয়েছে। ভেনিজুয়েলার সঙ্গে সম্প্রতি সখ্য বাড়ছিল চিন, রাশিয়া এমনকি ইরানেরও। তাই ভেনিজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠেন ট্রাম্প। আমেরিকার হাতে বন্দি হওয়ার আগে মাদুরো নিজেও সেকথা বার বার জানিয়েছিলেন।
তবে শুধুমাত্র মাদুরোই নন, তাঁর আগে দেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজও দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের বাণিজ্যিকীকরণের ঘোর বিরোধী ছিলেন। আমেরিকার তাবড় সংস্থাকে দেশে ঢুকতে দেননি তিনি। সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন হুগো। তিনি ‘সম্পদ নির্ভর জাতীয়তাবাদে’ বিশ্বাসী ছিলেন। নিজের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার পক্ষপাতী ছিলেন হুগো। সাফ জানিয়েছিলেন, ভেনিজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে যদি কেউ লাভবান হন, তা দেশের সাধারণ নাগরিকই হবেন। তাঁদের সম্পদের বলে কোনও বিদেশি সংস্থাকে লাভবান হতে দেবেন না তিনি। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিলেন হুগো। যত বড় সংস্থাই বিনিয়োগ করুক না কেন, দেশীয় সংস্থাগুলির অংশীদারিত্ব বেশি থাকতে হবে বলে নীতি প্রণয়ন করেছিলেন। ভেনিজুয়েলাকে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করতে চেয়েছিলেন হুগো, কমাতে চেয়েছিলেন আমেরিকার উপর নির্ভরশীলতা। যে কারণে আমেরিকা ও ইউরোপের ব্যাঙ্কে গচ্ছিত থাকা দেশের সব সোনা ফিরিয়ে আনতেও নির্দেশ দেন।
