নয়াদিল্লি: বাংলাদেশে ফের সংখ্য়ালঘু হিন্দু খুন। মুদিখানার দোকানের মালিক শরৎ মণি চক্রবর্তীকে খুন করা হল এবার। এই নিয়ে গত ১৮ দিনের ছ’জন সংখ্যালঘু হিন্দু খুন হলেন বাংলাদেশে। ফলে দেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে মহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বাংলাদেশের সরকারের তরফে এখনও পর্যন্ত এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। (Hindu Man Killed in Bangladesh)
এবারের ঘটনা সামনে এসেছে নরসিংদীর জেলার চরসিন্দুর বাজার থেকে। সেখানে মুদিখানার দোকান চালাতেন শরৎ। সোমবার রাতে চরসিন্দুর বাজারেই তাঁর উপর হামলা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পলাশ উপজেলার অন্তর্গত ওই ব্যস্ত বাজারে, নিজের দোকানে কাজে ব্যস্ত ছিলেন শরৎ। সেই সময় তাঁর উপর হামলা চালায় অজ্ঞাত পরিচয় দুষ্কৃতীরা। (Bangladesh Situation)
সোমবার রাত ১০টা নাগাদ শরতের উপর হামলা হয় বলে জানা গিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ধারাল অস্ত্র নিয়ে কয়েকজন হামলা চালান। তাতে গুরুতর আহত হন শরৎ। সেই অবস্থায় স্থানীয়রাই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। হাসপাতালে ভর্তি করার কিছু ক্ষণের মধ্যেই মারা যান শরৎ। শরতের বাবা মদন চক্রবর্তী। বাড়ির বড় ছেলে ছিলেন শরৎ। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় নামডাকও ছিল।
শরতের স্ত্রী অন্তরা মুখোপাধ্যায় গৃহবধূ। তাঁদের ছেলে অভীক চক্রবর্তীর বয়স ১২ বছর। আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত ছিলেন শরৎ। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। পরবর্তীতে নরসিংদীর ব্রাক্ষন্দীতে বাড়ি করেন। সেখানেই পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন শরৎ। এক আত্মীয় জানিয়েছেন, সহজ-সরল মানুষ ছিলেন শরৎ ও তাঁর পরিবারের লোকজন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্নও ছিলেন শরৎ। গত ১৯ ডিসেম্বর ফেসবুকে সেই নিয়ে মুখও খোলেন তিনি। লেখেন, ‘চারিদিকে এত আগুন, এত হিংসা। আমার জন্মভূমি মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে’।
পাড়া-প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, শরৎ অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছিলেন, অত্যন্ত মানবিক ছিলেন, সামাজিক ভাবে দায়বদ্ধ ছিলেন। কোনও শত্রু ছিল না তাঁর। হিন্দু বলেই শরৎকে খুন করা হল কি না, সেই প্রশ্ন তুলছেন প্রতিবেশীরাই। বাংলাদেশের সমাজকর্মী বাপ্পাদিত্য বসু এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। তাঁর কথায়, “বাংলাদেশে এক হিন্দুর রক্ত শুকনোর আগেই আর এক হিন্দুকে খুন করা হচ্ছে। রাণার মৃত্যুর রেশ কাটার আগেই শরৎকে খুন করা হস। এভাবে চললে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দুদের অস্তিত্বই থাকবে না।”
বাপ্পাদিত্য সাফ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের মদতেই সংখ্যালঘু হিন্দুদের হত্যা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে হিন্দু হলেই মেরে ফেলা হতে পারে। শরৎকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতেন বাপ্পাদিত্য। তিনি জানিয়েছেন, দুষ্কৃতীরা শরতের থেকে মোটা টাকা দাবি করছিল। বাংলাদেশে থাকতে হলে টাকা দিতে হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল তাঁকে। ‘জিজিয়া’ দিতে বলা হয় শরৎকে। পুলিশের কাছে গেলে স্ত্রীকে অপহরণ করার হুমকিও দেওয়া হয়। বাপাদিত্য বলেন, “দুষ্কৃতীরা বলে, ‘চুপচাপ টাকা দিয়ে দে। বেশি চিৎকার করিস না। তোর ভারত বা তোর বাবা নরেন্দ্র মোদি এলেও জিজিয়া আদায় করা আটকাতে পারবে না’।”
ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিমদের কাছ থেকে যে কর আদায় করার চল রয়েছে, তাকেই বলা হতো ‘জিজিয়া’। অমুসলিমদের জীবন, সম্পত্তি রক্ষা এবং ধর্মাচারণের অধিকার সুরশ্রিচ রাখতে ওই কর নেওয়ার চল ছিল। ভারতে কুতুবউদ্দিন আইবক ‘জিজিয়া’ চালু করেছিলেন (মতান্তরে মহম্মদ বিন কাসিম)। যদিও মুঘল সম্রাট আকবর ক্ষমতায় এসে সেটি বাতিল করে দেন। পরবর্তীতে ঔরঙ্গজেব সামরিক চাকরির বিনিময়ে নতুন করে ‘জিজিয়া’ চালু করলে বিদ্রোহ হয় দেশে, যার জেরে ‘জিজিয়া’ আদায়ের সিদ্ধান্ত স্থগিতও রাখতে হয় ঔরঙ্গজেবকে।
শরতের মৃত্যুতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে বাংলাদেশে। কারণ সোমবারই বাংলাদেশে খুন হয়েছেন আর এক হিন্দু যুবক, রাণা প্রতাপ বৈরাগী। মনীরামপুর এলাকায় পেশায় সাংবাদিক রাণাকে গুলি করে হত্য়া করা হয়। বরফ কারখানার বাইরে ডাকা হয়েছিল রাণাকে। মোটর সাইকেলে চেপে সেখানে হাজির হয় দুষ্কৃতীরা। দুই পক্ষের মধ্যে বচসা হয় বলে খবর। এর পরই রাণাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুষ্কৃতীরা।
