নয়াদিল্লি: যুদ্ধ-সংঘাত মেটানোর জন্য নিজেকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিদার হিসেবে তুলে ধরছিলেন এযাবৎ। কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ভেনিজুয়েলায় সামরিক পদক্ষেপ করিয়েছেন, বন্দি করিয়েছেন দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে। মাদুরোকে সরানোর পর ভেনিজুয়েলার শাসনভার দেশের বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর কাঁধে গুরুদায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে বলে ভেবেছিলেন অনেকেই। কিন্তু তাঁর পরিবর্তে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডেলসি রদ্রিগেজ। তাঁর নিযুক্তিতে কোনও আপত্তিই তোলেনি আমেরিকা। বরং ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাঁদের কথা মতো না চললে বিপদে পড়তে হতে পারে ডেলসিকে। আর তাতে মারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বলে মনে করছেন। কারণ সটান ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কার ভাগ করে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন তিনি। (US Attacks Venezuela)
রাতবিরেতে ভেনিজুয়েলায় বোমাবর্ষণ, দেশের প্রেসিডেন্ট এবং ফার্স্টলেডিকে বন্দি, এসবের কিছুই আগে থেকে তাঁর জানা ছিল না বলে দাবি মারিয়ার। ভেনিজুয়েলায় সামরিক পদক্ষেপ করার জন্য, মাদুরোকে বন্দি করার জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। আমেরিকার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন বলেও জানিয়েছেন। কিন্তু ইদানীংকালে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কথাই হয়নি বলে দাবি মারিয়ার। Fox News-কে তিনি বলেন, “গত ১০ অক্টোবর ট্রাম্পের সঙ্গে কথা হয়। ওই দিনই নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা হয়। তার পর থেকে কথা হয়বি। কিন্তু ভেনিজুয়েলার সাধারণমানুষের পক্ষ থেকে বলতে চাই, ওঁর এই সাহসী পদক্ষেপের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। নার্কো-সন্ত্রাসী শাসকের বিরুদ্ধে যে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করেছেন উনি, মাদুরোকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য কৃতজ্ঞ আমরা।” (Maria Corina Machado)
কট্টর দক্ষিণপন্থী রাজনীতিক হিসেবেই পরিচিত মারিয়া। ২০২৩ সালের নির্বাচনে ৯৩ শতাংশ ভোট দেখিয়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন মাদুরো। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার রাস্তাও বন্ধ হয়ে যায় মারিয়ার জন্য। প্রায় এক বছর লুকিয়ে ছিলেন তিনি। শেষে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে, ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার নিতে নরওয়ে উড়ে যান। এখন তিনি কোথায় আছেন কেউ জানেন না। তবে ভেনিজুয়েলায় ফিরতে যে আগ্রহী, তা নিজেই জানিয়েছেন। ভেনিজুয়েলায় ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা’র জন্যই নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় মারিয়াকে, যে পুরস্কারের জন্য আগাগোড়া নিজেকে দাবিদার হিসেবে তুলে ধরছিলেন ট্রাম্প। মাদুরোকে বন্দি করার পর সেই মারিয়ার হাতে কেন ভেনিজুয়েলার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হল না, প্রশ্ন করা হয় ট্রাম্পকে। উত্তরে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় ওঁর নেত্রী হয়ে ওঠা কঠিন। ওঁর পক্ষে সেই সমর্থনও নেই, দেশের অন্দরে সেই সম্মানও নেই ওঁর। মহিলা ভাল, কিন্তু সেই সম্মান নেই।”
BREAKING 🚨 Venezuelan Maria Corina Machado just stunned the WORLD by saying on behalf of the Venezuelan people she WANTS TO GIVE her Nobel Peace Prize to President Donald Trump
Venezuelan people are CELEBRATING
I TRUST TRUMP 100% pic.twitter.com/tC81jBHpek
— MAGA Voice (@MAGAVoice) January 6, 2026
তাই প্রশ্ন উঠছে নোবেল শান্তি পুরস্কার হাতছাড়া হওয়াতেই কি মারিয়ার উপর চটে রয়েছেন ট্রাম্প? কারণ মারিয়া নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতার পর হোয়াইট হাউসের তরফে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়, “আবারও প্রমাণ হয়ে গেল যে নোবেল কমিটি শান্তির চেয়ে রাজনীতিকে এগিয়ে রাখে।”সেই সময় ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল, “যিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, আমাকে ফোন করেছিলেন। বলেন, ‘আপনার হয়েও সম্মান গ্রহণ করছি আমি। আপনার সত্যিই এটা প্রাপ্য ছিল’। আমি বলিনি যে, দিয়ে দিন তাহলে। উনি হয়ত দিয়েও দিতেন।” Foundation for Defense of Democracies-এর শীর্ষ আধিকারিক মার্ক মন্টগোমারি বলেন, “মারিয়াকে নিয়ে নিজের আসল অনুভূতিই ব্যক্ত করেছেন ট্রাম্প। লাই ডিটেক্টর পরীক্ষা হোক। নোবেল হাতিয়ে নেওয়ার জন্যই হয়ত মারিয়ার অনুরাগী নন উনি।” ট্রাম্প যদিও বলেন, “ওঁর (নোবেল) জেতার কথাই নয়। তবে তার সঙ্গে আমার সিদ্ধান্তের কোনও যোগ নেই।”
সেই নিয়ে চর্চার মধ্যে নিজেই ট্রাম্পকে বার্তা দিয়েছেন মারিয়া। তাঁর বক্তব্য, “নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার খবর পেয়েই আমি সেটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উৎসর্গ করি। কারণ ওঁর প্রাপ্য ছিল ওটা। গত ৩ জানুয়ারি উনি যা করে দেখিয়েছেন, তা অসম্ভব ছিল বলেই মত অনেকের। আমি মনে করি, ওঁর এটা প্রাপ্য ছিল। উনি যা বলেন, তা করে দেখান, এটা দুনিয়ার সামনে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ন্যায় বিচারের দিন হিসেবে ৩ জানুয়ারি দিনটি ইতিহাসে লেখা থাকবে। একটা মাইলফলক। শুধুমাত্র ভেনিজুয়েলাবাসীর জন্যই নয়, মানবতার জন্যও একটি বড় পদক্ষেপ।” Fox News-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মারিয়া বলেন, “এখনও দিইনি। তবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে ওঁকে বলতে চাই, আমরা, ভেনিজুয়েলাবাসী ওটি নিশ্চিত ভাবে (নোবেল) ওঁকে দিতে চাই।”
মারিয়ার এই মন্তব্য নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি ট্রাম্প। তবে তাঁর সরকার জানিয়েছে, ভেনিজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের কোনও লক্ষ্য় নেই আমেরিকার। তবে সেখানে একটি অনুগত সরকার দেখতে চায় তারা, যারা আমেরিকার তৈল সংস্থাগুলির হাতে নিজেদের সম্পদ তুলে দেবে। এর আগে, ট্রাম্প যদিও জানিয়েছিলেন, আপাতত আমেরিকাই ভেনিজুয়েলা চালাবে। সেখানকার তেলের উপরও আমেরিকার কর্তৃত্বই বজায় থাকবে। ট্রাম্পের সেই প্রস্তাবেও আপত্তি জানাননি মারিয়া। বরং এতে ভেনিজুয়েলা ‘জ্বালানি হাব’ হয়ে উঠবে বলে মত ছিল তাঁর। মারিয়ার বক্তব্য ছিল, “আইনের শাসন আনব আমরা, বাজার উন্মুক্ত করে দেব। নিরাপদে বিনিয়োগ করা যাবে।” কিন্তু মারিয়া ট্রাম্পের প্রতি আস্থা ব্যক্ত করলেও, তাঁকে নিয়ে তেমন কোনও ইঙ্গিত দেননি ট্রাম্প।
