নয়াদিল্লি: যুদ্ধজয়ের ঘোষণা আগেই করে দিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু যতটা ভাবা হয়েছিল, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যে ততটা সহজ হচ্ছে না, সেই নিয়ে কথা শুরু হয়েছে ওয়াশিংটনেই। সেই আবহেই আমেরিকাকে জব্দ করতে ইরান কার্যত ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ প্রয়োগ করতে চলেছে বলে খবর। জানা যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে শর্তসাপেক্ষে জাহাজ চলাচলে অনুমতি দিতে পারে ইরান। তবে সেক্ষেত্রে ডলার নয়, চিনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেনের শর্ত বেঁধে দিতে পারে তারা। (US Dollar vs Chinese Yuan)
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলই প্রথম ইরানে হামলা চালায়। সেই থেকে নয় নয় করে দু’সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলছে। আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের হামলার মুখে পড়ে পাল্টা জবাব দিতে কসুর করছে না ইরান। সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে তারা, যাতে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিয়েছে এশিয়া-সহ গোটা বিশ্বে। তবে এতেই থামতে নারাজ তেহরান। জানা যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের শর্ত হিসেবে ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে পারে তারা। (US Iran War)
আমেরিকার ডলারকে ধসিয়ে দিয়ে ইরান এমন পরিকল্পনা করছে বলে CNN-কে জানিয়েছেন ইরানের এক আধিকারিক। তাঁর দাবি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে পৃথিবীর ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়। মূলত ডলার ব্যবহৃত হলেও, আমেরিকা এবং ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়ার তেল কেনাবেচা করতে রাশিয়ার রুবল বা চিনের ইউয়ান ব্যবহার করে কিছু দেশ। তবে খুব শীঘ্র সেই সমীকরণ বদলে যেতে পারে।
আমেরিকার ডলারের পরিবর্তে বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারের চেষ্টা আজকের নয়। মাঝে BRICS দেশগুলিও নিজস্ব মুদ্রা চালু করার চেষ্টা ছিল। সেই সময় কড়া হুঁশিয়ারি দিতে শোনা যায় ট্রাম্পকে। চিনও বহু বছর ধরে ডলারের পরিবর্তে নিজেদের মুদ্রাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্র সঞ্চিত বিদেশি মুদ্রা হিসেবে ডলার এখনও এগিয়ে। হরমুজ গিয়ে জ্বালানি সরবরাহে ইরান যদি শর্ত বেঁধে দেয়, সেক্ষেত্রে জ্বালানি ব্য়বসার সমীকরণে বড় পরিবর্তন ঘটবে। ইরানের এই পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির উপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
১৯৭১ সালের আগে পর্যন্ত আমেরিকার ডলারকে সরাসরি সোনায় বদলে নিত বিভিন্ন দেশ। কিন্তু আমেরিকার তদানীন্তন প্রেসিডেন্ড রিচার্ড নিক্সন সেই রীতিতে ইতি টানেন। স্থায়ী এক্সচেঞ্চ রেটের পরিবর্তে ফ্লোটিং কারেন্সির আবির্ভাব ঘটে। বন্ধু দেশগুলির সঙ্গে কোনও রকম পরামর্শ না করেই নিক্সন নিয়মে পরিবর্তন ঘটান। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ১৯৭৪ সালে সৌদি আরব এবং উপসাগরীয় দেশগুলি ডলারে তেল বিক্রি করতে রাজি হয়। সেই থেকে ডলারে ব্যবসাবাণিজ্য় শুরু হয়। প্রত্যেক দেশের ব্যাঙ্কে সঞ্চিত বিদেশি মুদ্রা হিসেবে জায়গা করে নেয় ডলার।
কিন্তু গত দু’সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যে যুদ্ধ চলছে, তাতে জ্বালানি নিরাপত্তা জোর ধাক্কা খেয়েছে। জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হয়েছে ভারত-সহ তাবড় দেশগুলিতে। কারণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। বিনা অনুমতিতে সেখান দিয়ে জাহাজ নিয়ে গেলে উড়িয়ে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম ৭০ থেকে বেড়ে ১১০ ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। বহু জাহাজ আটকে রয়েছে সেখানে। হামলা হয়েছে কমপক্ষে ১৬টি তেলের ট্যাঙ্কারে।
পরিস্থিতির মোকাবিলায় সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে আমেরিকা। ইতিমধ্যেই খার্গ আইল্য়ান্ডে হামলা চালিয়েছে তারা। অন্য দেশগুলিকেও সেনা নামাতে আহ্বান জানিয়েছে তারা। ইরানের তেলের পরিকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োগ বা হুমকির দিকে এগোচ্ছে না ইরান, বরং ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানকে প্রাধান্য দেওয়ার কৌশলী পদক্ষেপ করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরাসরি আমেরিকার অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক আধিপত্যের গোড়ায় আঘাত হানতে চাইছে তারা।
হরমুজ নিয়ে এমনিতে কড়া অবস্থান বজায় রাখলেও, চিন এবং রাশিয়ার প্রতি ইরানের মনোভাব এখনও নরমই। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখনও পর্যন্ত চিনকে ১১.৭ থেকে ১৬.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ করেছে ইরান। নিজেরা নিরাপত্তা দিয়ে ওই তেল বেজিংয়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডসের ছায়া সংগঠন। চিন ইউয়ানেই তেল কেনে। তাদের ট্যাঙ্কার স্বাধীন ভাবে ঘুরে বেড়াতেও পারে সাগরে। অর্থাৎ সাগরে ইউয়ানের আধিপত্য গড়ে ওঠার ভিত একরকম প্রস্তুতই রয়েছে।
আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে বেজিং এবং মস্কো থেকে তেহরান সাহায্য়ও পাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। তাই ইরান ইউয়ানকে অগ্রাধিকার দিলে, বেজিংও তাদের পাশে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। তাঁদের মতে, এতে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও বিভাজন তৈরি হবে। ডলারে তেল কিনতে এমনিতেই বাড়তি খরচ পড়ে। সরবরাহে সময়ও লাগে বেশি। তাই এশিয়ার দেশগুলি বিশেষ করে ইউয়ানে লেনদেনের দিকে ঝুঁকতে পারে। সেই পরিস্থিতি ঠেকাতে বেগ পেতে হতে পারে আমেরিকাকে। বিষয়টি নিয়ে আমেরিকার অন্দরেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের নীতি নিয়ে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে সেখানে।
