রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য : মুসলমানদের বিজেপির জুজু আর মহিলাদের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের দেড় হাজার টাকার লোভ দেখিয়ে সর্বস্তরে এবং সর্ব ক্ষেত্রে চুরি, তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট চালানো তৃণমূল সরকারকে শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিতাড়িত করলো। গত দশ বছর আমরা পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ নাগরিক অদ্ভূত এক নেইরাজ্যের বাসিন্দা হয়ে গেছিলাম। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের চাকরি নেই, কল-কারখানা নেই, স্কুল কলেজে শিক্ষক নেই, আট হাজার এর উপর মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়ির আশে পাশে সরকারি স্কুল নেই, আইনের শাসন নেই, মেয়েদের সুরক্ষা নেই, সরকারি কর্মচারীর ডিএ নেই। ছিলো শুধু মূল্যবৃদ্ধির সূচকের সঙ্গে সঙ্গতিহীন নামমাত্র ভাতা। দেড়হাজারি ভাতার থেকে সরকারি হোক বেসরকারি হোক গ্রুপডি চাকরিও যে অনেক অনেক বেশী দামী, তা কে এই কৌরবকূলকে বোঝাবে! কিন্তু কুশাসনে অভ্যস্ত নেই-রাজ্যের বাসিন্দাদেরও যে ক্ষোভের বেলুন একদিন ফেটে যেতে পারে – সেটা এক যুগের বেশি সময় ক্ষমতায় আসীন স্তাবক পরিবৃত কুশাসকের দল বোঝবার চেষ্টাই করেনি।
নাগরিকেরা কিন্তু তাদের ক্ষোভ দীর্ঘ এই সময়ে বারবার বোঝাতে চেয়েছেন। পঞ্চায়েত পৌরসংস্থার প্রত্যেকটি নির্বাচনে বিশেষত ২০১৮ এবং ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধী দল- সিপিএম, কংগ্রেস এবং বিজেপি প্রার্থীদের বলপূর্বক প্রার্থীপদে নমিনেশন ফাইল করতে দেওয়া হয়নি। আর যারা নমিনেশন ফাইল করতে সমর্থ হত তাদের অধিকাংশকে বাধ্য করা হতো প্রার্থীপদ প্রত্যাহারে। আর তারপরও যারা সাহস দেখিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীতায় থেকে যেতো তাদের ভাগ্যে জুটতো হুমকি, ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, মার, এমনকি প্রার্থী- সমর্থকদের মৃত্যুও। সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুসারে, ২০১৮ এবং ২০২৩ এর নির্বাচনোত্তর হিংসার বলি হয়েছিলো প্রতিক্ষেত্রে পঞ্চাশের কাছাকাছি মানুষ। অর্থাৎ গণতন্ত্রের পরিধি নিতান্ত সীমিত বললে কম বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে গত দশ বছর গণতন্ত্রের শ্বাসরোধ করে রাখা হয়েছিল, যেখান থেকে মুক্তি চাইছিল পশ্চিমবঙ্গের আপামর সাধারণ মানুষ।
চাইলেই কি আর তৃণমূল রাজত্বে মুক্তির স্বাদ পাওয়া যায়! কিন্তু ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে পুলিশ প্রশাসন, গুন্ডা এবং রাজনীতিবিদদের বন্ধনে গঠিত এক অভূতপূর্ব মাকড়সার জাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের মুক্তির স্বাদ পরিবেশন করতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠলো ইলেকশন কমিশন। ভোটার তালিকা থেকে ডুপ্লিকেট, মৃত, ভুয়ো এবং একেবারে চলে যাওয়া ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে তালিকার ঝাড়াই-বাছাই শুরু হলো। এটা ঠিক যে, এই ঝাড়াই-বাছাই করতে গিয়ে ২৭ লক্ষ সহ নাগরিকের নাম নির্বাচক তালিকায় বিবেচনাধীন হয়ে গেল। কিন্তু এদের বাদ দিয়ে যারা থাকলো তারা সম্পূর্ণভাবে আসল ভোটার- এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের কোন সন্দেহই রইল না। নির্বাচন ঘোষণার দিন থেকে কমিশন কড়া হাতে পুলিশ এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের বিভিন্ন স্তরে বদলি করে কড়া বার্তা দিলেন যে নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করাই কমিশনের একমাত্র উদ্দেশ্য। বস্তুত সেই উদ্দেশ্যকে তারা গণনার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বজায় রাখতে সবিশেষ সচেষ্ট ছিলেন। ফলে রথেদলে নাগরিক ভোট দিতে উৎসাহী হয়ে পড়ল। ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৯৩% ভোট দান সারা ভারতের নিরিখেই এক অভাবনীয় ঘটনা।
স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট পড়লে সেই ভোটে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে যায় -সেটা নির্বাচনী বিশ্লেষণের প্রাথমিক পাঠ বলা যেতে পারে। তৃণমূল দল তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোটের দুটি মূল ভিত্তি ছিল। এক লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাওয়া মহিলারা এবং দুই বিজেপির জুজু দেখা মুসলমানেরা। কিন্তু এবারে নির্বাচনে নারী সুরক্ষার অভাব লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে ছাপিয়ে মহিলাদেরকে তৃণমূলের বেষ্টনী থেকে দূরে নিয়ে গেল। অবশ্যই এক্ষেত্রে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা দেড় হাজার থেকে তিন হাজার করবার বিজেপির প্রতিশ্রুতি ভোট কাটার ইস্পাতের ফলাকে আরও দৃঢ় করে তুলেছিল। একইসঙ্গে মুসলমান সম্প্রদায়ের বেশ কিছু মানুষের ভোট আইএসএফ, কংগ্রেস, বাম দলগুলি এবং আমজনতা উন্নয়ন পার্টির মধ্যে ভাগ হয়ে গেল। মুসলমান ভোটের এই বিভাজন, ভোটের অংককে তৃণমূলের থেকে আরও দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। এর পাশাপাশি, হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট দিতে নিজ নিজ এলাকায় প্রত্যাবর্তন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে একান্তই পরিবর্তনশীল করে তুলল। মতুয়া সম্প্রদায়সহ তপশিলি জাতি পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ। দেখা গেল মতুয়া এবং রাজবংশী সহ তপশিলি জাতির মানুষেরাও বিজেপিকে দুহাত ভরে সমর্থন করলেন। বলা যেতে পারে তারা তৃণমূলের ভোটের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিলেন।
১৫ বছরের ক্ষমতার অহংকার ও ঔদ্ধত্য, যা তৃণমূলের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া নিচু তলার কর্মীদের মধ্যে হুমকি সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা করেছিল, ২০২৬ এর ভোটে সত্যিই তা খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ১৮৪ টা আসন পেয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সরকার গঠন করেছিল; কিন্তু ২০২৬-এ বিজেপি ২০৭ আসন নিয়ে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনেক উপরে গিয়ে সরকার গঠন করেছে। নতুন সরকার যেন তৃণমূলের এই পতনের ইতিহাস সম্বন্ধে সচেতন থাকে – পশ্চিমবঙ্গের আপামর নাগরিকের এইটাই একমাত্র আবেদন।
লেখক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব। এবিপি আনন্দ ও এবিপি নেটওয়ার্কের কোনও সম্পাদকীয় মতামত নেই।
