Mutual Fund : গত কয়েক বছরে ভারতীয় শেয়ার বাজারে মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগের জোয়ার এসেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান’ বা SIP এখন সঞ্চয়ের অন্যতম সেরা মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিগত কিছু সময়ে শেয়ার বাজারের ক্রমাগত ওঠানামা বা অস্থিরতার কারণে অনেক বিনিয়োগকারীই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বেশ কয়েক মাস নিয়মিত টাকা জমা দেওয়ার পরেও পোর্টফোলিওতে কাঙ্ক্ষিত বৃদ্ধি না দেখে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ছেন।
এই পরিস্থিতিতে অনেক বিনিয়োগকারীই SIP বন্ধ করে টাকা তুলে নেওয়ার কথা ভাবছেন, আবার কেউ কেউ মিউচুয়াল ফান্ড ছেড়ে ব্যাঙ্ক ফিক্সড ডিপোজিট (FD) বা রিকারিং ডিপোজিটের (RD) মতো নিরাপদ অপশনের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারের এই ওঠানামায় ভয় পেয়ে সিদ্ধান্ত বদল করলে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন আপনি।
SIP-এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে বড় তহবিল (Wealth Creation) গড়তে চাইলে কোন কোন ভুলগুলি এড়িয়ে চলবেন? আসুন জেনে নেওয়া যাক।
১. বাজার পড়লেই SIP বন্ধ করার ভুল নয়
শেয়ার বাজারে ধস নামলেই অনেক বিনিয়োগকারী আতঙ্কিত হয়ে SIP বন্ধ করে দেন। তারা ভাবেন, বাজার আবার যখন চাঙ্গা হবে তখন নতুন করে বিনিয়োগ শুরু করবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় ভুল।
আসলে, বাজারের এই চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে SIP-এর আসল ম্যাজিক, যাকে বলা হয় ‘রুপি কস্ট অ্যাভারেজিং’ (Rupee Cost Averaging)।
বাজার যখন চাঙ্গা থাকে: আপনার জমানো টাকায় ফান্ডের কম ইউনিট কেনা হয়, তবে আগের ইউনিটের ভ্যালু বাড়ে।
বাজার যখন মন্দা থাকে: ফান্ডের নেভ (NAV) বা দাম কমে যায়। ফলে একই টাকায় আপনি অনেক বেশি পরিমাণ ইউনিট কিনতে পারেন।
তাই বাজার পড়ে গেলে যারা SIP চালু রাখেন, দীর্ঘমেয়াদে তাদের গড় বিনিয়োগের খরচ অনেক কমে যায় এবং বাজার যখন ঘুরে দাঁড়ায়, তখন তারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হন।
২. বারবার রিটার্ন চেক করার অভ্যাস বদলান
অনেকেই SIP শুরু করার পর থেকেই প্রতি মাসে বা প্রতি কোয়ার্টারে (তিন মাসে) লাভ-ক্ষতির হিসেব কষতে বসে যান। মনে রাখবেন, এসআইপি কোনো স্বল্পমেয়াদি ফাটকা ব্যবসা নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। প্রতি মাসে পোর্টফোলিও দেখলে বাজারের অস্থিরতা আপনাকে মানসিক চাপ দেবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, SIP-এর প্রকৃত রিটার্ন অন্তত ৫ থেকে ১০ বছর পর মূল্যায়ন করা উচিত।
৩. কেবল ‘অতীতের রিটার্ন’ দেখে ফান্ড বাছা বিপজ্জনক
কোনো মিউচুয়াল ফান্ড গত ২-৩ বছরে ২৫% বা ৩০% রিটার্ন দিয়েছে মানেই যে আগামী দিনেও সেই একই রিটার্ন দেবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। শেয়ার বাজারের পারফরম্যান্স সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। তাই অন্ধের মতো কেবল অতীতের পারফরম্যান্স দেখে বিনিয়োগ করলে পরবর্তীতে লোকসানের মুখে পড়তে পারেন। ফান্ডের ফান্ডামেন্টাল এবং সেটি আপনার লক্ষ্যের সাথে মিলছে কি না, তা দেখা জরুরি।
৪. লক্ষ্য এবং সময়সীমা স্থির না করা
বিনিয়োগ শুরু করার আগেই ঠিক করে নেওয়া উচিত আপনি ঠিক কত বছরের জন্য এবং কী উদ্দেশ্যে (যেমন: সন্তানের পড়াশোনা, বাড়ি কেনা বা রিটায়ারমেন্ট) টাকা জমাচ্ছেন। যদি আপনার লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে বাজারের সাময়িক ওঠানামাকে পাত্তাই দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
৫. সময় থাকতে সতর্ক না হওয়া
যদি আপনি ৫ বছরের জন্য কোনো লক্ষ্য মাথায় রেখে SIP শুরু করেন, তবে মনে রাখবেন—৪র্থ বছর থেকেই আপনাকে সতর্ক হতে হবে। লক্ষ্য পূরণের সময় যত এগিয়ে আসবে, বাজার যদি তখন মন্দা থাকে, তবে আপনার জমানো টাকার ভ্যালু কমে যেতে পারে। তাই লক্ষ্য পূরণের ১ বা ২ বছর আগে থেকেই ইকুইটি ফান্ড থেকে টাকা ধীরে ধীরে নিরাপদ ডেট ফান্ড বা লিকুইড ফান্ডে সরিয়ে নেওয়া (SWP বা STP-এর মাধ্যমে) বুদ্ধিমানের কাজ।
শেষ কথা:
ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসের ফিক্সড ডিপোজিট নিশ্চিত রিটার্ন দিলেও, তা মুদ্রাস্ফীতি বা ইনফ্লেশনকে (Inflation) হারাতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতিকে টেক্কা দিয়ে বড় তহবিল গড়তে মিউচুয়াল ফান্ড SIP-এর বিকল্প কমই আছে। তাই বাজারে মন্দা দেখে ভয় না পেয়ে, ধৈর্য ধরে বিনিয়োগ বজায় রাখাই কোটিপতি হওয়ার আসল চাবিকাঠি।
