সন্দীপ সরকার, কলকাতা: সৌরাশিস লাহিড়ী, অরিন্দম দাসরা বাংলার বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের কোচের পদ থেকে ছাঁটাই হওয়ার পর অভিযোগ করেছিলেন, বারবার বলা সত্ত্বেও রিভিউ মিটিংয়ে বসার সময় পাননি সিএবি কর্তারা। অথচ সেই সিএবি কর্তারাই রোজ সন্ধ্যায় বসে যাচ্ছেন বিবৃতি লিখতে। বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে। আর তাতেও একের পর এক আত্মঘাতী গোল খেয়ে যাচ্ছে সৌরভের (Sourav Ganguly) সিএবি! প্রশ্ন উঠছে সিএবির অন্দরমহল থেকেই।
পঙ্কজ রায়ের জন্মদিনে পুত্র প্রণব রায়কে আমন্ত্রণ জানাতে ভুলে যাওয়া কিংবা বাসি ফুল দিয়ে কিংবদন্তি-স্মরণের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল সিএবি-র বিরুদ্ধে। খোদ প্রণব রায় জানিয়েছিলেন, তাঁকে ডাকা হয়নি। অথচ আমদাবাদে আইপিএল ফাইনাল দেখার ফাঁকেও বিবৃতি তৈরি করে ফেলেছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। জানিয়েছিলেন, প্রণব রায় আমন্ত্রিত ছিলেন। ‘বাসি ফুল’ ব্যবহারের অভিযোগও পরিকল্পিত কালি ছেটানোর চেষ্টা ছিল বলে জানিয়েছিলেন সৌরভ। কোনও অভ্যন্তরীণ তদন্তের পথে না হেঁটে। পরে প্রণব রায় ‘বাসি ফুল’ কাণ্ডে সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চেয়ে সিএবি সচিব বাবলু কোলেকে চিঠি দেন। উত্তর পাননি। সিএবি-র একাংশ বলছে, সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করলেই যে মুখ পুড়বে বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থার! তাই নীরবতা।
আরও পড়ুন: সৌরভ-ঘনিষ্ঠ সিএবি কর্তার বিরুদ্ধে আইনি চিঠি, ‘যা করেছি ক্রিকেটের স্বার্থে’, বলছেন সুরজিৎ
শনিবার গ্রেফতার হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন বিধায়ক, এবারের ভোটে হেরে যাওয়া সুজয় হাজরা। যিনি সিএবি-র জেলা কোচিং কমিটির চেয়ারম্যান। তারপরই মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সচিব সঞ্জিৎ টরাই অভিযোগ করেন যে, বার্ষিক সাধারণ সভায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে সরিয়ে এসেছিলেন সুজয় হাজরা।

এবিবি লাইভ বাংলাকে সঞ্জিৎ টরাই বলেছিলেন, ‘গতবার সিএবি-র বার্ষিক সাধারণ সভার আগে আমাদের বৈঠকে ঠিক হয়, আমিই মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করব। সেই মতো ফর্ম ফিল আপ করে নির্ধারিত সময়ে প্রতিনিধি মারফত তা সিএবি-তে পাঠাই। কিন্তু সিএবি-র হেড ক্লার্ক সেটি নিতে অস্বীকার করেন। আমার প্রতিনিধিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর আমাদের ফের বৈঠক হয়। সেখানে সুজয় হাজরা জানান, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চেয়েছেন আমি নই, সিএবি এজিএমে সুজয় যাবেন। আমি পিছিয়ে আসতে বাধ্য হই।’

যে অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে রবিবার গভীর রাতে সিএবি পাল্টা বিবৃতি দেয় যে, সঞ্জিৎ টরাই সংস্থাকে কালিমালিপ্ত করার জন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এসব বলেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। কিন্তু সেই বিবৃতি দিতে গিয়ে ঘুরিয়ে সঞ্জিৎ টরাইয়ের অভিযোগকেই স্বীকৃতি দেয় সিএবি। সঞ্জিতের অভিযোগ ছিল, তিনি প্রতিনিধি মারফত বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রতিনিধিত্ব করার মনোনয়ন পাঠালেও সিএবি-র হেড ক্লার্ক তা জমা নেননি। সিএবি বিবৃতিতে লিখেছে, ‘শ্রীযুক্ত টরাই ৪ সেপ্টেম্বর একজন প্রতিনিধিকে সিএবি-র মূল কার্যালয়ে অ্যাপেনডিক্স এ (প্রতিনিধিত্ব করার ও মনোনয়ের ফর্ম) জমা দিতে পাঠান। যদিও সেই ফর্ম অসম্পূর্ণ ছিল কারণ তাতে মেদিনীপুর জেলা ক্রিকেট সংস্থার কার্যকরী সমিতির বৈঠকের অঙ্গীকারপত্র ছিল না, যেখানে তাঁকে প্রতিনিধি হিসাবে বার্ষিক সাধারণ সভায় পাঠানোর কথা লেখা থাকবে। নথি জমা নেওয়া ও যাচাই করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএবি-র অফিসকর্মী ইলেক্টোরাল অফিসারকে জমা দেওয়ার আগে সেটা শ্রী টরাইকে জানান এবং কী কী নথি নেই বলেন। টরাই দ্রুত সেই কাগজ জমা করবেন বলে আশ্বাস দেন। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলা ক্রিকেট সংস্থা সম্পূর্ণ অ্যাপেনডিক্স এ জমা করে এবং সেটিতে নতুন অঙ্গীকারপত্র ছিল, যেখানে সুজয় হাজরাকে প্রতিনিধি করার কথা বলা হয়।’
সিএবি-র সেই বিবৃতি নিয়েই শুরু হয়েছে তোলপাড়। কারণ, সিএবি স্বীকার করে নিয়েছে যে, ইলেক্টোরাল অফিসারের কাছে জমা হওয়ার আগে মনোনয়নপত্র যাচাই করেছিলেন সিএবি-র অফিসকর্মী। কিন্তু মনোনয়নপত্র যাচাই করার এক্তিয়ার কি ইলেক্টোরাল অফিসার ছাড়া আর কারও আছে? কোন নিয়মে সিএবি-র হেড ক্লার্ক বিশ্বপতি সেন সেই কাগজ যাচাই করেছিলেন, সেই প্রশ্ন ঘিরে বিতর্কের ঝড়। বলা হচ্ছে, সিএবি-র অফিসকর্মীদের কাজ তো শুধু ফর্ম জমা নিয়ে ইলেক্টোরাল অফিসারের কাছে তা পাঠিয়ে দেওয়া। সেই ফর্ম অফিসকর্মী দেখেন কীভাবে?
সিএবি-র ইলেক্টোরাল অফিসার সুশান্ত রঞ্জন উপাধ্যায়। সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে লোঢা কমিটির সুপারিশে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ও সমস্ত রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সমস্ত মনোনয়ন খতিয়ে দেখা এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করার এক্তিয়ার এক এবং একমাত্র ইলেক্টোরাল অফিসারের। সেখানে সিএবি-র কর্মী কী করে নথি যাচাই করলেন? এ তো সুপ্রিম কোর্টকে বুড়ো আঙুল দেখানোর সামিল? প্রশ্ন তুলছে সিএবি-রই একাংশ।
সিএবি-র কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাস বললেন, ‘যদি সিএবির হেড ক্লার্ক নথি যাচাই করে থাকেন, তাতে অন্যায় কিছু দেখছি না। কারণ তাঁর একটা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কোনও মনোনয়নে কিছু একটা নথি নেই দেখলে সদস্যদের বলতেই পারেন। তাতে অন্তত ইলেক্টোরাল অফিসার সেই মনোনয়ন বাতিল করবেন না। সদস্যদের স্বার্থ ভেবেই হয়তো এটা করা হয়েছিল। ইলেক্টোরাল অফিসার অসম্পূর্ণ মনোনয়ন বাতিল করে দিলে সেই জেলার কেউ হয়তো প্রতিনিধিত্বই করতে পারলেন না। তাই সদস্যদের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে এটা করা হয়ে থাকতে পারে।’
কিন্তু মনোনয়নের নথি যাচাই করা কি হেড ক্লার্কের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে? সিএবি কোষাধ্যক্ষ বলছেন, ‘আমরা রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে অনেক সময় ওয়েটার বলেন, এই ডিশটার সঙ্গে এই খাবারটা ট্রাই করে দেখুন। কিংবা, দুটো চিকেনের ডিশ হয়ে যাচ্ছে, একটা এটা নিয়ে দেখুন। আমরা কি প্রশ্ন করি যে সেটা ওয়েটারের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না!’ যোগ করলেন, ‘তবে আমি সেই সময় পদে ছিলাম না। সেই সময়ের পদাধিকারীরা বলতে পারবেন ঠিক কী হয়েছিল।’
২০২৫ সালের বার্ষিক সাধারণ সভার আগে পর্যন্ত সিএবি-র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন অমলেন্দু বিশ্বাস। তিনি বললেন, ‘সিএবি গঠনতন্ত্রের ৬২ (২) ধারা অনুযায়ী গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করার দায়িত্ব ইলেক্টোরাল অফিসারের। তিনিই নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেন। ২০২৫ সালের বার্ষিক সাধারণ সভার আগে ১৫ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা থেকে দুপুর ৩টে পর্যন্ত মনোনয়নপত্র স্ক্রুটিনি হওয়ার কথা ছিল। ১৯ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। আমি জানি না কী করে ইলেক্টোরাল অফিসারের বাইরে অন্য কেউ নথি যাচাই করতে পারে!’
প্রশ্নবাণ ধেয়ে যাচ্ছে সিএবি-র বর্তমান প্রশাসকদের দিকে। সৌরভের সিএবি আবার কী বিবৃতি তৈরি করে, দেখার অপেক্ষায় ময়দান।
