সন্দীপ সরকার, কলকাতা: বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতি। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর সরগরম বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা সিএবি-র অন্দরমহলও।
প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক ও সিএবি-র জেলা কোচিং কমিটির চেয়ারম্যান সুজয় হাজরা গ্রেফতার হওয়ার পরই দুদিন আগে বোমা ফাটান মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সচিব সঞ্জিৎ তোরই। অভিযোগ করেন যে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে সরিয়ে সিএবি-র বার্ষিক সাধারণ সভায় এসেছিলেন সুজয় হাজরা। সঞ্জিৎ এ-ও জানিয়েছিলেন যে, তিনি প্রতিনিধি মারফত মনোনয়নপত্র পাঠিয়েছিলেন সিএবি-তে। কিন্তু সিএবি-র হেড ক্লার্ক বিশ্বপতি সেন সেটি নিতে অস্বীকার করেন। তাঁর প্রতিনিধিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর সুজয় হাজরা সিএবি এজিএমে যান।
যে অভিযোগ উড়িয়ে বিবৃতি দিয়েছিল সিএবি। জানিয়েছিল, সঞ্জিৎ তোরই সংস্থাকে কালিমালিপ্ত করার জন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এসব বলেছেন। যদিও সিএবি-র হেডক্লার্ক কী করে মনোনয়নপত্রের নথি যাচাই করেছিলেন, সেই প্রশ্ন ওঠে জোরালভাবে। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুযায়ী ইলেক্টোরাল অফিসার সুশান্ত রঞ্জন উপাধ্যায় ছাড়া আর কারও মনোনয়নপত্র স্ক্রুটিনি করার এক্তিয়ারই নেই। তার কোনও সদুত্তর দিতে পারেনি সিএবি।
বিতর্কের মাঝে এবার মুখ খুললেন সিএবি-র প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়। গত বছর মনোনয়ন জমা দেওয়ার সেই পর্বে যিনি সিএবি-র মসনদে ছিলেন। প্রাক্তন ক্রিকেটার তথা বর্তমান সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের দাদা স্নেহাশিস এবিপি লাইভ বাংলাকে বললেন, ‘অ্যাপেনডিক্স এ (প্রতিনিধিত্ব করার ও মনোনয়নের ফর্ম) জমা দেওয়ার সময় কী কী নথি লাগবে, তা নিয়ে ইলেক্টোরাল অফিসারের স্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে। সেই নথি নেই দেখেই হেড ক্লার্ক বিশ্বপতি মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রতিনিধি সঞ্জিৎ তোরইকে জানিয়েছিলেন। তাতে মেদিনীপুর জেলা ক্রিকেট সংস্থার কার্যকরী সমিতির বৈঠকের অঙ্গীকারপত্র ছিল না, যেখানে তাঁকে প্রতিনিধি হিসাবে বার্ষিক সাধারণ সভায় পাঠানোর কথা লেখা থাকবে। তবে পরে মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার যে অ্যাপেনডিক্স এ জমা পড়ে, সেখানে তো সুজয় হাজরার নামই ছিল। এবং সেখানে সঞ্জিৎ তোরই নিজে সই করেছিলেন।’
কিন্তু ইলেক্টোরাল অফিসার ভিন্ন আর কারও যেখানে নথি যাচাই করার এক্তিয়ারই নেই, সিএবি-র হেড ক্লার্ক সেখানে কী করে নথি যাচাই করতে গেলেন? স্নেহাশিস বললেন, ‘মানছি ইলেক্টোরাল অফিসার ছাড়া আর কারও নথি যাচাই করার কথা নয়। সেটাই নিয়ম। কিন্তু সদস্যদের স্বার্থের কথা ভেবেই বিশ্বপতি সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। ওই অ্যাপেনডিক্স এ জমা পড়ে গেলে পরে ইলেক্টোরাল অফিসার তা বাতিল করে দিতে পারতেন। সেক্ষেত্রে মেদিনীপুরের কোনও প্রতিনিধিই থাকত না সিএবি এজিএমে। তখন তো এই সঞ্জিৎ-ই বলতেন, তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করতে দেওয়া হল না। আমরা চেয়েছিলাম সব সংস্থার প্রতিনিধি থাকুক।’
প্রাক্তন সিএবি প্রেসিডেন্ট যোগ করলেন, ‘ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের স্পেশ্যাল জেনারেল মিটিংয়ে আমার নাম পাঠাতে দেরি হয়ে গিয়েছিল একবার। পরে অবশ্য বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয় আমাকে। কিন্তু সেবার বোর্ডের নির্বাচনের ব্যাপার ছিল না। সিলেকশন হয়েছিল। নির্বাচন হলে আমাকে প্রতিনিধিত্ব করতে দেওয়া হতো না। কিন্তু গতবার সঞ্জিৎ তোরই যখন ফর্ম জমা করতে লোক পাঠিয়েছিলেন, তখনও ঠিক ছিল না সিএবি-তে নির্বাচন হবে কি না। নির্বাচন হলে ইলেক্টোরাল অফিসার সেই ফর্ম বাতিল করতে পারতেন।’
যদিও সেটা শুনে সিএবি-র একাংশ বলছে, এ-ও তো কার্যত মেনেই নেওয়া হল যে, নিয়ম বহির্ভুত কাজ করা হয়েছিল। সে যতই সদস্যদের স্বার্থের কথা বলা হোক না কেন। সেই সময়কার সিএবি ভাইস প্রেসিডেন্ট অমলেন্দু বিশ্বাস সোমবার রাতেই বলেছিলেন, ‘সিএবি গঠনতন্ত্রের ৬২ (২) ধারা অনুযায়ী গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করার দায়িত্ব ইলেক্টোরাল অফিসারের। তিনিই নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেন। ২০২৫ সালের বার্ষিক সাধারণ সভার আগে ১৫ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা থেকে দুপুর ৩টে পর্যন্ত মনোনয়নপত্র স্ক্রুটিনি হওয়ার কথা ছিল। ১৯ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। আমি জানি না কী করে ইলেক্টোরাল অফিসারের বাইরে অন্য কেউ নথি যাচাই করতে পারে!’ সব মিলিয়ে পাল্টা প্রশ্নও রয়ে গেল।
আরও পড়ুন: ইলেক্টোরাল অফিসার ছাড়া কেউ মনোনয়ন যাচাই করেন কীভাবে? উঠছে প্রশ্ন, আত্মঘাতী বিবৃতি সিএবির!
মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থাতেও পত্রযুদ্ধ শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার লাইফ মেম্বার তাপস দে পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসককে চিঠি দিয়ে অভিযোগ করেছেন, ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন হয় এবং বর্তমান কমিটি সে বছর ২৮ নভেম্বর দায়িত্বে আসে। তাপস দে-র অভিযোগ, সেই কমিটির মেয়াদ ২ বছরের এবং ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু তারপর নির্বাচন হয়নি। তাঁর অভিযোগ, মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও সেই কমিটি আর্থিক লেনদেন করছে, কাজ চালাচ্ছে। অবিলম্বে তা বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। সেই চিঠির কপি সিএবি ও IFA সহ সব অনুমোদিত ক্রীড়া সংস্থায় পাঠানো হয়েছে।
এ নিয়ে সঞ্জিৎ তোরইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বললেন, ‘উনি জানেন না যে, কমিটি ২ বছরের নয়, ৩ বছরের জন্য গঠিত হয়েছিল। এ নিয়ে জেলাশাসকের নির্দেশিকাও আছে। গত বছর নভেম্বর মাসে সেই মেয়াদকাল শেষ হওয়ার পর ডিসেম্বর মাস থেকে দু’দফায় আমরা জেলাশাসকের কাছে নির্বাচন করার আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়ার জন্য সরকারী কর্মচারীরা প্রবল ব্যস্ত ছিলেন বলে সেটা করা যায়নি বলে জানিয়েছেন খোদ জেলাশাসক। এটা নিয়ে জেলাশাসককে জিজ্ঞেস করা হলেই সত্যিটা জানা যাবে। উনি দ্রুত নির্বাচন করা হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন।’ সঞ্জিৎ আরও বললেন, ‘সিএবি-র এজিএমের সময় মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার বর্তমান কমিটি বৈধভাবেই ক্ষমতায় ছিল। জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন করার দায়িত্ব মাননীয় জেলাশাসকের। যতক্ষণ না নির্বাচন হচ্ছে, আমাদেরই কাজ চালাতে বলা হয়েছে। ১৫ জুন এ নিয়ে জেলাশাসকের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে।’
তাঁর অভিযোগের প্রেক্ষিতে হইচই দেখে সঞ্জিৎ তোরই বললেন, ‘সিএবি-র বিবৃতি দেখে আমি খুশি হয়েছি। কারণ, আমার অভিযোগই মেনে নেওয়া হয়েছে। অ্যাপেনডিক্স ফর্মের স্ক্রুটিনি যে এক্তিয়ার বহির্ভূত হলেও হেড ক্লার্ক করেছিলেন, সেটাকে তো মান্যতা দিল সিএবি।’
