সন্দীপ সরকার, কলকাতা: বাংলা ক্রিকেটে বিতর্কের রেশ থামার লক্ষণই নেই। বরং অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে রোজই নতুন করে জলঘোলা হচ্ছে।
একাধিক জেলাশাসক ও ক্লাবের চিঠির ধাক্কায় সিএবি-র যুগ্মসচিব নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়। ২০ জুলাই যে নির্বাচনের জন্য বিশেষ সাধারণ সভা (SGM) ডাকা হয়েছিল। ১২ জুলাই ছিল প্রার্থীপদে ও সভায় প্রতিনিধিত্ব করার মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। তার ঠিক আগে অন্তত ১৫টি জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রধান হিসাবে জেলাশাসক ও দশটি ক্লাব চিঠি দিয়ে জানায়, এসজিএমে প্রতিনিধিরাও যেন লোঢা আইন মেনে আসেন। অর্থাৎ, বয়স ৭০ বছর পেরিয়ে গেলে কিংবা ক্রিকেট প্রশাসনে ৯ বছর অতিবাহিত করে ফেললে যেন বৈঠকে যোগ দিতে না পারেন। পত্রবোমার পর যুগ্মসচিব পদে কোনও মনোনয়নই জমা পড়েনি। নির্বাচন বাতিল বলে ঘোষণা করেন ইলেক্টোরাল অফিসার সুশান্ত রঞ্জন উপাধ্যায়।
কেন নির্বাচন হল না, এ নিয়ে সদস্যদের ধোঁয়াশা কাটাতে বুধবার এমার্জিং জেনারেল মিটিং (জরুরি সাধারণ সভা) ডেকেছেন সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। সেই সভা নিয়েও জট তৈরি হয়েছিল। প্রতিবাদীদের অনেকেই প্রশ্ন তুলছিলেন, জরুরি সভায় প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রেও লোঢা আইন মানা হবে তো?
সেই পরিস্থিতিতে এবার সদস্যদের চিঠি পাঠালেন সিএবি-র ইলেক্টোরাল অফিসার। জানালেন, ২০ জুলাই সিএবি-র বিশেষ সাধারণ সভা সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদিত লোঢা কমিটির নিয়ম মেনেই হওয়ার কথা ছিল। ইলেক্টোরাল অফিসার লিখেছেন, ‘সিএবি গঠনতন্ত্রের ৮ (৬) নিয়মটি বিবেচনা করে দেখেছি। এই নিয়মে নির্দিষ্টভাবে বলা রয়েছে কারা ‘অযোগ্য’। বলা আছে ‘অযোগ্য’রা সিএবি-র কোনও কমিটিতে থাকতে পারবেন না বা অ্যাপেক্স কাউন্সিলের সদস্য হতে পারবেন না। তাঁরা মনোনীত ব্যক্তি বা সদস্যও হতে পারবেন না। কিন্তু অনুমোদিত সদস্যেরা প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন না, এমন কিছু বলা নেই।’
সেই সঙ্গে ইলেক্টোরাল অফিসার লিখেছেন, ‘গত ৭টি বার্ষিক সাধারণ সভা এবং ২টি বিশেষ সাধারণ সভা এই নিয়ম অনুসরণ করেই হয়েছে। সেখানে কোনও অনুমোদিত সদস্য, কোনও জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে আপত্তি করা হয়নি। ২০ জুলাই সিএবির বিশেষ সাধারণ সভার বিজ্ঞপ্তিতে কোনও আইনগত ত্রুটি বা পদ্ধতিগত অনিয়ম নেই।’
ইলেক্টোরাল অফিসার চিঠি পাঠানোর পরই সিএবি-র শাসক গোষ্ঠী থেকে কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট অভিষেক ডালমিয়াকে। বলা হচ্ছে, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকাকালীনও লোঢা কমিটির নিয়ম মেনে এজিএম কিংবা এসজিএম করেননি। সিএবি সূত্রে খবর, বিশেষ সাধারণ সভায় অংশগ্রহণের জন্য মোট ১০৩টি মনোনয়ন জমা পড়েছিল। ৪৫টি মনোনয়ন জমা পড়েনি। সিএবি-র জরুরি সভায় হাজিরার শর্ত অনুযায়ী, ১০৩ জন মনোনয়ন জমা দেওয়া প্রতিনিধি বুধবারের বৈঠকে থাকতে পারবেন। বাকি ৪৫ প্রতিনিধিকে অথরাইজেশন চিঠি আনতে হবে। তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা। বলা হচ্ছে, যে বিশেষ সাধারণ সভা ও নির্বাচন বাতিলই হয়ে গেল, সেই বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়ন জমা দেওয়া ব্যক্তিরা কী করে ওই একই মনোনয়নের ভিত্তিতে জরুরি সাধারণ সভায় থাকতে পারেন? গোটা পদ্ধতির বৈধতা নিয়েই যখন প্রশ্ন, তাকে উপেক্ষা করে কী করে বৈঠক হতে পারে?
যদিও সিএবির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায় এবিপি লাইভ বাংলাকে বলছিলেন, ‘প্রথমত, এবারের বিশেষ সাধারণ সভায় মনোনয়নের সঙ্গে অ্যাপেনডিক্স জমা করতে বলা হয়েছিল কারণ, এবার নির্বাচন ছিল। নির্বাচন না থাকলে অ্যাপেনডিক্স জমা করার বিষয় থাকে না। যাঁরা অ্যাপেনডিক্স জমা করেননি, তাঁদের ক্ষেত্রে, কিংবা সকলের ক্ষেত্রেই অথরাইজেশন লেটার সহ বুধবারের বৈঠকে যোগ দিতে সমস্যা কোথায়? আমি নিজেও সিটি অ্যাথলেটিক ক্লাব থেকে অ্যাপেনডিক্স জমা করা সত্ত্বেও চিঠি নিয়ে বৈঠকে যোগ দেব।’
এরপরই একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের অগ্রজ। স্নেহাশিস বললেন, ‘আমি কুলিং অফে রয়েছি বলে এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। তবে অভিষেক ডালমিয়া প্রেসিডেন্ট থাকাকালীনই তো লোঢা আইন বলবৎ হয়ে গিয়েছিল। তাহলে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যে এজিএম, এসজিএম হয়েছে, সেখানে লোঢা আইন মেনে প্রতিনিধিত্ব করা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি কেন?’
স্নেহাশিস আরও বললেন, ‘ক্রীড়ামন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়ে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ভুয়ো পরিচয়পত্র তৈরির জন্য তাঁর আমলে ৫০ জনের বেশি ক্রিকেটারকে নির্বাসিত করার কথা বলেছেন। কিন্তু আমি সিএবি প্রেসিডেন্ট থাকাকালীনই প্রথম আধার কার্ডের পাশাপাশি ক্রিকেটারদের প্যান কার্ড, ভোটার কার্ড, পাসপোর্ট, ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট জমা দেওয়ার নিয়ম চালু করি। যাতে পরিচয়পত্র নিয়ে জালিয়াতি না হয়। সেই নিয়ম মেনেই এবার প্রায় সাড়ে তিনশো ক্রিকেটার বাতিল হয়েছে। তাহলে উনি ওঁর মেয়াদে করেননি কেন? তাছাড়া সব অভিযোগপত্রে একই বয়ান, পুরোটাই পরিকল্পিত নয় তো?’
যা শুনে প্রাক্তন সিএবি প্রেসিডেন্ট, কিংবদন্তি ক্রিকেট প্রশাসক জগমোহন ডালমিয়ার পুত্র অভিষেক বললেন, ‘আমিই প্রথম আধার আপডেট হিস্ট্রি চালু করেছিলাম। উনি যদি এত কড়াকড়ি করে থাকেন, তাহলে ওঁর প্রেসিডেন্ট হিসাবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে সাড়ে তিনশো ভুয়ো পরিচয়পত্র বানিয়ে খেলা ক্রিকেটার বেরোল কী করে?’
আপনার আমলে কি লোঢা আইন মেনে সিএবি-র সভায় প্রতিনিধিত্ব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল? অভিষেক বললেন, ‘যা বলব আজকের বৈঠকের পরে।’ শোনা গেল, শাসক গোষ্ঠী তামিলনাড়ু ক্রিকেট সংস্থার একটি মামলায় দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের রায় তুলে ধরে আজকের বৈঠকে বক্তব্য পেশ করবে। পাল্টা প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী শিবিরও। জরুরি সাধারণ সভায় ঝড় উঠল বলে।
