August 2, 2026
b0c8b61bd6aefa10a92eeabdee030bba17854228617281466_original.jpg
Spread the love


সন্দীপ সরকার, কলকাতা: পিচ তৈরির মাটি ‘অবৈধ’ কারবারির থেকে কেনার অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় সিএবি। যে ব্যক্তি বাইশ গজ প্রস্তুত করার জন্য মাটি সরবরাহ করেন, সরকারি কড়াকড়িতে তিনি মাটির জোগান দিতে পারেননি। যা নিয়ে রীতিমতো উত্তর ২৪ পরগনা জেলাশাসকের দফতরে হাজির হয়ে গিয়েছিলেন সিএবি প্রতিনিধিরা! যে খবর প্রথম লিখেছিল এবিপি লাইভ বাংলা।

সেই খবরের প্রতিক্রিয়ায় দীর্ঘ বিবৃতি জারি করল বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা। বৃহস্পতিবার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সিএবি জানাল, প্রতিষ্ঠিত সরবরাহকারীর কাছ থেকেই মাটি কেনা হয়। যদিও সেই বিবৃতিতে বিভ্রান্তি আরও বাড়ল। সেই সঙ্গে জন্ম দিল একঝাঁক প্রশ্নবাণের।

ঘটনাটি ঠিক কী?

বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রত্যেক মরশুমে সমস্ত অনুমোদিত ক্লাব ও সংস্থাকে পিচ তৈরির জন্য মাটি সরবরাহ করে সিএবি। উদ্দেশ্য, ময়দানের সব মাঠে সমমানের পিচ তৈরি করা। তবে এবার সেই মাটি নিয়েই বিপত্তি। উত্তর ২৪ পরগনার যে ব্যক্তি মাটি সরবরাহ করে থাকেন, তিনি সিএবিকে জানান, পুলিশ আটকে দেওয়ায় গাড়ি করে মাটি কলকাতায় পাঠাতে পারছেন না। তিনি এও জানান যে, উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসকের সঙ্গে কথা বলে অনুমতি নিতে হবে। সিএবি-র দুই প্রতিনিধি উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসকের দফতরে গিয়ে কথা বলে জানতে পারেন যে, মাটি সরবরাহকারী ওই ব্যক্তির মাটি কাটার বৈধ লাইসেন্সই নেই! অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি সংস্কার – ADM LR) সিএবি প্রতিনিধিদের প্রশ্ন করেন, কেন বৈধ ডিলারদের থেকে মাটি নেওয়া হয় না? বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, তিনি ১২ জন বৈধ ডিলারের নাম ও ফোন নম্বর দেন সিএবি প্রতিনিধিদের। এবারের মতো একটা ব্যবস্থা করার আশ্বাসও দেওয়া হয় সিএবিকে।

সেই খবর প্রকাশ পেতেই শোরগোল পড়ে সিএবি-তে। তার তিনদিন পরে বিবৃতি জারি করল সিএবি। সেখানে লেখা হল, ‘সংবাদমাধ্যমে খবরটি দেখে বিস্মিত সিএবি। গত ১৫ বছর ধরে (২০১০ সাল থেকে) অনুমোদিত মাঠগুলিকে পিচ তৈরির মাটি সরবরাহ করে সিএবি। যাতে সমমানের, ভাল খেলার উপযুক্ত স্পোর্টিং উইকেট তৈরি করা যায় ও বাংলার ক্রিকেটের উন্নয়ন হয়। ২০১০ সাল থেকে একজন প্রতিষ্ঠিত ভেন্ডরের কাছ থেকে সব বাণিজ্যিক নিয়ম মেনে মাটি কেনা হয়। সিএবি সবরকম স্বচ্ছতা বজায় রাখে। যথাযথ দরপত্র নেওয়া হয়। এই একই ভেন্ডরের থেকে কিছু ক্লাব স্বাধীনভাবেও মাটি কেনে যার সঙ্গে সিএবির যোগাযোগ নেই। ভেন্ডর কোথা থেকে মাটি তোলেন, তা দেখা সিএবি বা কোনও ক্লাবের এক্তিয়ার নয়।’

বিবৃতিতে আরও লেখা হয়েছে, ‘সাম্প্রতিক প্রশাসনিক নির্দেশের কথা মাথায় রেখে সিএবি রাজ্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে মাটি কিনতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সিএবি সম্পূর্ণ আইন মেনে কাজ করে। এ নিয়ে যে কোনওরকম অভিযোগ, অবৈধভাবে মাটি সংগ্রহকে উৎসাহিত করার কথা অস্বীকার করছে সিএবি। স্বচ্ছভাবে সিএবির অনুমোদিত জায়গায় (চ্যানেলে) টেন্ডার করে সরকারি নির্দেশ মেনে ভেন্ডর নির্ধারিত করার জন্য দায়বদ্ধ সিএবি।’

বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থার বিবৃতি দেখে ময়দানের একাংশ হতবাক। বাসি ফুল কাণ্ড থেকে শুরু করে কোচ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, সব ক্ষেত্রেই সিএবি-র অবস্থান ও পরস্পরবিরোধী বিবৃতিতে ধোঁয়াশা কাটার পরিবর্তে সংশয়ের কালো মেঘ তৈরি হয়েছে। পিচের মাটি বিতর্কেও যার অন্যথা হল না বলেই মনে করছে সিএবি সদস্যদেরই একটা বড় অংশ। উঠছে একের পর এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন।

সিএবি যে মাটি কেনা নিয়ে স্বচ্ছ টেন্ডার করার কথা বিবৃতিতে জানিয়েছে, সেই বিজ্ঞপ্তি কোথায়? সিএবি-র ওয়েবসাইট বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও মাটি কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করার বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ছে না কারও। তা হলে ভেন্ডর নির্বাচনে স্বচ্ছতা মানা হল কীভাবে?

বলা হচ্ছে, ২০১০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠিত এক ভেন্ডরের থেকেই মাটি নেওয়া হচ্ছে। তবে কিউরেটর ও মাঠকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মাটি সরবরাহকারী ব্যক্তি বারবার বদলে গিয়েছে। সিএবি-র দাবি যথার্থ তো?

যে ব্যক্তিকে মাটি সরবরাহ করার জন্য অগ্রিম টাকা দিয়েছিল সিএবি, তিনি পুলিশি বাধায় মাটির গাড়ি কলকাতায় পাঠাতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন সিএবিকে। প্রশ্ন উঠছে, তিনি না পারলে অন্য কাউকে বরাত দিলেই তো মিটে যেত, তা হলে কেন উত্তর ২৪ পরগনা জেলাশাসকের দফতরে গিয়ে তদ্বির করবেন খোদ সিএবি প্রতিনিধিরা? যে কারণে এমনকী উত্তর ২৪ পরগনার অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি সংস্কার – ADM LR) সিএবি প্রতিনিধিদের প্রশ্ন করেছেন, কেন সিএবি এ বিষয়ে মাথা ঘামাচ্ছে? যে কাজ ডিলারের করার কথা, সেখানে সিএবির মতো নামী ক্রীড়া সংস্থা প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে কেন?

মাটি কীভাবে-কোথা কাটা হচ্ছে সেটা দেখা সিএবি-র এক্তিয়ার বহির্ভূত বলে জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। কিন্তু ভেন্ডর চূড়ান্ত করার সময় তাঁর বৈধ লাইসেন্স আছে কি না, কেন সেটা দেখা হচ্ছে না? বলা হচ্ছে, স্বচ্ছ টেন্ডার হলে মাটি কাটার লাইসেন্স জমা করা তো সরবরাহকারীদের নিয়মের মধ্যে পড়ে। সেটা মানা হচ্ছে কি?

বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, উত্তর ২৪ পরগনার অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি সংস্কার – ADM LR)-এর দফতর থেকে সংশ্লিষ্ট ভেন্ডরকে যে জমি থেকে মাটি কাটা হবে তার দাগ নম্বর ও খতিয়ান দিতে বলা হয়েছিল। পরে দেখা যায় সেই জমি অন্য মালিকের। এহেন ‘কারচুপি’ যে ব্যক্তির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, অবিলম্বে তাঁকে বাদ দিয়ে কেন নতুন করে টেন্ডার ডাকা হচ্ছে না?

সর্বোপরি, সরকারের যে ‘সাম্প্রতিক নির্দেশাবলীর’ কথা বলা হয়েছে সিএবি-র বিবৃতিতেও, সেগুলি কি নতুন কোনও নিয়ম? নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রণয়ন করেছে? নাকি আগেও ছিল?

২০১০ সাল থেকে পিচের মাটি জোগান দেওয়ার কথা বলেছে সিএবি। তখনও কি টেন্ডার করে বরাত দেওয়া হতো? প্রাক্তন সিএবি সচিব, প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ বিশ্বরূপ দে-কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে এবিপি লাইভ বাংলাকে তিনি বললেন, ‘কীরকম মাটি, কোথাকার মাটি নেওয়া হবে, সেটা নির্ধারণ করেন কিউরেটর। আগে যা ঠিক করতেন প্রবীর মুখোপাধ্যায়। তিনি মারা যাওয়ার পর থেকে এটা ঠিক করেন সুজন মুখোপাধ্যায়। তাঁরাই মূলত সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করতেন বা করেন। তারপর সেই ব্যক্তিকে দরপত্র দিতে বলতাম। তিনি দর দেওয়ার পর সিএবিতে নোটিসবোর্ডে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হতো। তারপর মাটি কেনা হতো।’

কোনও জমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটা হচ্ছে কি না, সেটা কি সিএবি-র কেউ গিয়ে দেখতেন? ভেন্ডরের বৈধ কাগজপত্র আছে কি না দেখা হতো? বিশ্বরূপ বলছেন, ‘না, সেটা সিএবি-র পক্ষে সম্ভবও নয়। আর টেন্ডার করা তো বিরাট ব্যাপার। খরচসাপেক্ষ। তাছাড়া শুধু উত্তর ২৪ পরগনাই বা কেন, হুগলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা বা অন্য জেলার বৈধ ডিলারদের থেকে কেন মাটি নেওয়া হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও তো তোলা হতে পারে। এত বড় করে বিষয়টি করলে আসল কাজই হবে না।’ যদিও ঘটনা হচ্ছে, এখন প্রযুক্তির যুগে ওয়েবসাইটে, সোশ্যাল মিডিয়া পেজে ই-টেন্ডার করা ব্যয়বহুল তো নয় বটেই, দ্রুত সেরে ফেলা যায়। কেন সেই পথ ধরছে না সিএবি? আর যে ১২ জন বৈধ ডিলারের তালিকা দেওয়া হয়েছে, তাঁরা উত্তর ২৪ পরগনার হলেও রাজ্যের যে কোনও অংশ থেকে বৈধভাবে মাটি কেটে আনতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁকে নির্দিষ্ট জায়গা থেকেই মাটি কাটতে হবে, এমন নিয়ম নেই।

গ্রাউন্ডস কমিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান মদনমোহন ঘোষ, যিনি ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন, তিনি বললেন, ‘কিউরেটর মাটির নমুনা দেখে বলে দিতেন কোন মাটি লাগবে। সেই মাটির পরীক্ষাও করা হতো। তারপর কোটেশন নেওয়া হতো। সেই মাটি ভেন্ডর কোথা থেকে তুলছে, তা কখনও দেখতে যাইনি।’ কিন্তু কোটেশন নেওয়ার সময় ভেন্ডরের লাইসেন্স আছে কি না, তা দেখা হতো না কেন? সদুত্তর নেই।

সিএবির গ্রাউন্ডস কমিটির আর এক প্রাক্তন প্রধান, যিনি সিএবি-র যুগ্মসচিবও ছিলেন, সেই দেবব্রত দাস বললেন, ‘আমি দায়িত্বে থাকাকালীন যেখান থেকে মাটি নেওয়া হতো, সেখানে যেতাম। আর ২০১০ সাল থেকে গত ১৬ বছরের কথা বলা হচ্ছে। ১৫-১৬ বছর আগে কোথা থেকে মাটি কাটা হয়েছিল, সেটা কি কেউ মনে রেখেছে? প্রত্যেকবার তো এক জমি থেকে মাটি কাটা হয় না। আর ভুল থাকলে সেটা শুধরে নিতে সমস্যা কোথায়? লোঢা কমিটি তো সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার কথা বলেছে। বিবৃতি না দিয়ে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করা হলে বরং কাজের কাজ হতো।’

আরও পড়ুন: পিচ তৈরিতে ‘চোরাই মাটি’! সরকারি কড়াকড়িতে বিপাকে সিএবি, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে সরগরম ময়দান



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Enable Notifications OK No thanks