March 15, 2026
088862c139c2d362de5bed0704e7c4881772714654114338_original.jpg
Spread the love


নয়াদিল্লি: পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে যুদ্ধ। বুধবার ভারত মহাসাগরে ইরানের জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে আমেরিকা। অতর্কিত হামলায় সলিল সমাধি ঘটেছে জাহাজের, মারা গিয়েছেন ৮৭ সৈনিক। সেই হামলার পাল্টা ভারত মহাসাগরে দ্বিতীয় জাহাজ পাঠাচ্ছে ইরান। ইরানের রণতরী IRIS Dena-র উপর এই হামলার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। ভারতের গায়েও এই হামলার আঁচ পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইরানের তরফে ইতিমধ্যেই প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ভারতের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেই যে সৈনিকদের প্রাণ গিয়েছে, তাও উল্লেখ করেছে তারা। নাকের ডগায় ইরানের জাহাজের উপর হামলা নিয়ে এখনও পর্যন্ত নীরব কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার, যা নিয়ে দেশের অন্দরেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। (IRIS Dena Attacked)

শ্রীলঙ্কার গল থেকে ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে IRIS Dena-য় হামলা চালায় আমেরিকা। আমেরিকার দাবি, আন্তর্জাতিক জলসীমার উপর থাকা অবস্থায় হামলা চালানো হয় জাহাজটিতে। তবে ভারতের উপকূল থেকে জাহাজটির দূরত্ব খব বেশি ছিল না, কন্যাকুমারী থেকে মেরেকেটে ১৫৬৫ কিলোমিটার। সাবমেরিন থেকে জোড়া টর্পেডো হামলা চালিয়ে জাহাজটিকে ডুবিয়ে দেয় আমেরিকা। সেই সময় ইরানের সৈনিক-সহ প্রায় ১৩০ জন উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডুবন্ত জাহাজ থেকে ৩২ জনকে উদ্ধার করতে পেরেছে শ্রীলঙ্কা। তবে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন ৬০ জন। শ্রীলঙ্কার বিদেশমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ জানিয়েছেন, বুধবার সকাল ৫টা বেজে ৮ মিনিটে বিপদবার্তা আসে উপকূলরক্ষী বাহিনীর কাছে। সেই সময় বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে জানান জাহাজের কর্মীরা। (Attack on IRIS Dena)

শ্রীলঙ্কা জানিয়েছে, ৬টা নাগাদ আমাদের নৌবাহিনীর জাহাজ বেরিয়ে যায়। ৭টা নাগাদ দ্বিতীয় জাহাজ পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জের উপকূল অনুসন্ধান এবং উদ্ধারকার্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক সমন্বয় সংগঠনের সদস্য শ্রীলঙ্কা। তাই নিজেদের দায়িত্ব মনে করেই উদ্ধারকার্যে হাত দেয় তারা। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর মুখপাত্র বুধিকা সম্পত জানান, যেখানে হামলা হয়, তা শ্রীলঙ্কার জলসীমার বাইরে ছিল। তার পরও উদ্ধারকার্য চালাতে কোনও ত্রুটি রাখা হয়নি। উদ্ধারকারীরা জাহাজ দেখতেই পাননি। খালি দেহ ভাসছিল জলে। জীবিত উদ্ধার করে কারাপিতিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন সকলে। মৃতদেহ যা পাওয়া যায়, পাঠানো হয় মর্গে। যে কয়টি মৃতদেহ উদ্ধার করা গিয়েছে, তা ফেরত চেয়ে শ্রীলঙ্কাকে অনুরোধ জানিয়েছে ইরান। এখনও উদ্ধারকার্য চলছে ভারত মহাসাগরে। শ্রীলঙ্কার বায়ুসেনাও উদ্ধারকার্যে যোগ দিয়েছে। 

IRIS Dena আকারে তুলনামূলক ছোট, ওজন ১৫০০ টন। ২০১৫ সালে সেটিকে ইরানের নৌবাহিনীর সাদার্ন ফ্লিটের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মূলত হরমুজ প্রণালী এবং ওমান উপসাগরেই মোতায়েন থাকত এযাবৎ। ওই যুদ্ধজাহাজে ভূমি থেকে আকাশে ছোড়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ছিল। শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংকারী ক্ষেপণাস্ত্র, কামান, মেশিন গান, টর্পেডো লঞ্চার, হেলিপ্যাড, রেডার সিস্টেমও ছিল জাহাজে। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ‘মাউন্ট ডেনা’র নাম অনুযায়ীই যুদ্ধজাহাজটির নামকরণ। ২০২৩ সালে জাহাজটিকে নিষিদ্ধ করে আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগ। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চলকালীন ইরান ওই জাহাজের মাধ্যমেই রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহ করছিল বলে দাবি করে আমেরিকা। নিষিদ্ধ করা হয় ড্রোন নির্মাণকারী সংস্থা আট এগজিকিউটিভ-কেও। 

কিন্তু আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের আবহে বুধবার ওই জাহাজটি ভারত মহাসাগরে কী করছিল? আসলে নৌমহড়া দিতে ওই জাহাজে চেপেই ভারতে পৌঁছন ইরানের সৈনিকরা। সাগরে পারস্পরিক সহযোগিতা, সমন্বয় এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে ফেব্রুয়ারি মাসে International Fleet Review, Milan-2026-এর আয়োজন করে ভারত। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ফিলিপিন্স, জার্মানি-সহ ৭৪টি দেশ ওই মহড়ায় অংশ নেয়। প্রথম বার নিজেদের নৌবহর নিয়ে হাজির হয় তারা। একই ভাবে মহড়ায় অংশ নেয় ইরান। মোট ৪২টি যুদ্ধজাহাজ, ২৯টি যুদ্ধবিমান এবং একাধিক সাবমেরিন নিয়ে চলে মহড়া। উপস্থিত ছিলেন বিশাখাপত্তনমে IRIS Dena-কে মহা সমারোহে অভ্যর্থনা জানায় ভারতের নৌবাহিনী। ২১ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে মহড়া, যার সমাপ্তি ঘটে ভারতের নিজস্ব যুদ্ধজাহাজ INS Vikrant-এ। এর আগে, ২০২৪ সালের ১২তম Milan মহড়াতেও অংশ নিয়েছিল IRIS Dena. মহড়া শেষ হওয়ার পর পারস্য উপসাগরেই ফিরে যাচ্ছিল জাহাজটি। কিন্তু ফেরা আর হল না। আমেরিকার সাবমেরিনের হামলায় সাগরে তলিয়ে গেল জাহাজটি। বেঘোরে প্রাণ গেল ইরানের নৌবাহিনীর সৈনিকদের। 

বুধবার জাহাজটিতে আক্রমণের খবর সামনে আসতে থমথমে হয়ে ওঠে বিশাখাপত্তনমও। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মহড়া দিতে এসে স্থানীয়দের সঙ্গেও আলাপ জমে ওঠে ইরানের ওই সৈনিকদের। একসঙ্গে সেলফি তোলা থেকে পার্কে আড্ডা, গ্লাস স্কাইওয়াক ঘুরে দেখা, কিছুই বাদ যায়নি। এমনকি স্থানীয় বাজার থেকে শিল্পকর্ম, শপিং মল থেকে পরিবার-পরিজনদের জন্য উপহারও কিনেছিলেন ইরানের ওই সৈনিকরা। ভারতের চিহ্ন নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বাড়িতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর বাড়ি ফেরই হল না তাঁদের অনেকের। ইরান জানিয়েছে, ভারতের আমন্ত্রণ পেয়ে, অতিথি হিসেবে সৈনিকদের পাঠিয়েছিল তারা। কিন্তু কোনও রকম সতর্কবার্তা ছাড়াই হামলা চালায় আমেরিকা। আমেরিকা যে নজির তৈরি করল, তাতে তাদের শেষ পর্যন্ত পস্তাতে হবে বলে হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ইরান। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ভারতের তরফে এখনও পর্যন্ত ওই জাহাজে হামলা নিয়ে কোনও বিবৃতি আসেনি, যা নিয়ে দেশের অন্দরেই প্রশ্ন উঠছে। ভারতের বরাবরের বন্ধু ইরানের প্রতি নরেন্দ্র মোদি সরকারের এহেন আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা। 

সেই সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রাক্তন চিফ অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, ‘ইরানের যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার এই ঘটনায় শুধুমাত্র প্রাণহানিই ঘটেনি, এটি উস্কানিমূলক পদক্ষেপও। জলভাগেও যুদ্ধ ডেকে আনার চেষ্টা, যাতে বিশ্ববাণিজ্যের উপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। অত্যন্ত নিন্দাজনক’। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জোরাবর দৌলত সিংহের মতে, “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আমেরিকার নৌবাহিনীকে ভারতের জলসীমার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে যদিও চুক্তি রয়েছে আমেরিকার, কিন্তু আমেরিকার এই আগ্রাসন এবং সামরিক হস্তক্ষেপ ভারতের জন্য বিপজ্জনক। বুদ্ধি খাটিয়ে, স্বাধীন ভাবে কাজ করার সময় এসেছে ভারত সরকারের।”

ভারতের নামে নামকরণ হলেও, ভারত মহাসাগর আন্তর্জাতিক জলসীমা ভারতের একার নয় বলেও যুক্তি দিচ্ছেন অনেকেই। কিন্তু এই ঘটনায় সাগরে ভারতের সুরক্ষা এববং নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাবমেরিন থেকে ইরানের জাহাজে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। যেভাবে জাহাজটিতে নির্ভুল হামলা চালিয়েছে তারা, তাতে ভারত মহাসাগরে তাদের উপস্থিতি যে বেশ মজবুত, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। টর্পেডো হামলায় জাহাজের নীচের অংশে থাকা কাঠ বা ধাতব অংশটিতে আঘাত করে। ফলে একেবারে তলিয়ে যায় জাহাজ। সেই কারণেই শ্রীলঙ্কার উপকূলরক্ষী বাহিনী জাহাজটিকে দেখতে পাননি। সাগরে জলের নীচে আমেরিকা আধিপত্য বিস্তার করছে বলে এর আগেও রিপোর্ট সামনে আসে। পারস্য উপসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর, ভারত মহাসাগরে তাদের ফিফথ ফ্লিটের উপস্থিতি চোখে পড়ে, যার সদর দফতর আবার বাহরাইনে। এই ফিফথ ফ্লিটের কাছে ১৫ থেকে ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজ থাকে, যার অন্তর্ভুক্ত সাবমেরিনও। দু’-একটি পরমাণু শক্তিসম্পন্ন সাবমেরিনও থাকে। ভারত মহাসাগরের নীচে অবাধ বিচরণ তাদের ভার্জিনিয়া এবং লস অ্যাঞ্জেলস ক্লাসের সাবমেরিনের। এই হামলায় আমেরিকার Indo-Pacific Command (PACOM)-এর কী ভূমিকা, তা নিয়েও চর্চা শুরু হয়েছে। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আগ্রাসন ঠেকানো, আমেরিকার স্বার্থরক্ষার দায়িত্ব তাদের কাঁধে। 

ভারত এবং আমেরিকার মধ্যে ২০১৬ সালে যে মউ স্বাক্ষরিত হয়, তার আওতায় পরস্পরের ঘাঁটি ব্যবহার করে জ্বালানি ভরা, মেরামতির কাজ সারা এবং সরবরাহ গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু ইরানের জাহাজের উপর এই হামলা ভারতকেও সংঘাতের আলোচনায় টেনে আনল বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। কারণ নিজেদের ভূখণ্ড থেকে দূরে, ভারতের কাছাকাছিই এই হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। বহু দশক ধরে ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ, সভ্যতানির্ভর সম্পর্ক ভারতের। জ্বালানি নিরাপত্তা, চবাহার বন্দরও সেই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই কংগ্রেস নেতা পবন খেরার প্রশ্ন, ‘ভারতের আমন্ত্রণে এসেছিল ইরানের জাহাজটি। ভারতের জলসীমার কিনারায়, আমেরিকার সাবমেরিন সেটিকে ডুবিয়ে দিয়েছে। নিজের প্রতিবেশী এলাকায় কি ভারতের প্রভাব খাটছে না আর? নাকি তাও ওয়াশিংটন এবং তেল আভিভের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে’? ভারত মহাসাগরে চিনের আধিপত্য এতদিন উদ্বেগের কারণ ছিল ভারতের কাছে। এই ঘটনার পর উল্টো দিকটিও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বেল মনে করছেন কূটনীতিকরা।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Enable Notifications OK No thanks