March 31, 2026
7c5ef0c812c14dcbcd5cb848e0226928177497659590664_original.jpg
Spread the love


মাঝে মাত্র তিনটে পাহাড়। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লে বেলাবেলি ছুঁয়ে আসা যায়। হেঁটেই পৌঁছে যাব প্রকাণ্ডের পাদদেশে। এতটাই সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা। যেন প্রকাণ্ড ফ্রেমে বাঁধানো অপরূপ একটা ছবি চোখের সামনে সর্বদা ধরা। সকালে চায়ের কাপ হাতে দেখছি সোনার জলে চান করা কাঞ্চনজঙ্ঘা। দুপুরে ভাত খেতে খেতে কাঞ্চনজঙ্ঘা। রাতে বরফ শীতল হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে পূর্ণিমার আলোয় ভেজা বরফচূড়া। সে দৃশ্য শুধু প্রাণভরে দেখার, ফ্রেম-বন্দী করার সাধ্য নেই কোনও ক্যামেরার। এমনটাই পেলিং। এককথায় ব্যালকনি থেকে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা।

শিলিগুড়ি হয়ে গ্যাংটক ঘুরে সেখান থেকে পেলিং। ভ্রমণ পরিকল্পনা হিসাবে খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়। দেখার থেকে জার্নি বেশি। কিন্তু, উপায় ছিল না। কম সময়ে বুড়ি ছোঁয়া ঘোরা হলে এমনটাই হবে জানা ছিল। তবু যেতেই হবে।  যাওয়ার পথে পড়ে  নামচি, রাবাংলা। ঘন কুয়াশা ঢাকা শহর। প্রায় কিছুই দেখা গেল না।  নামচি বা রাবাংলা আমাদের থাকার পরিকল্পনা ছিল না।  একটা প্রকাণ্ড বুদ্ধমূর্তি সহ সবুজ পাহাড়ের গায়ে বানানো পার্ক দেখলাম। তার পিছনে মেঘহীন দিনে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা ও স্লিপিং বুদ্ধ। আমরা দেখতে পাইনি।  শহরের কুয়াশা দেখে চা খেয়ে ফের রওনা হয়েছি।  গ্যাংটক থেকে সকালে বেরিয়ে সারাদিন জার্নি। পেলিং পৌঁছলাম বিকেলে। রাজধানী গ্যাংটক থেকে ১১৪ কিমি দূরে পাহাড়ের কোলে নীল চাদর ঢাকা একটা ছোট্ট শহর।    

পেলিং কাঞ্চনজঙ্ঘার নিকটতম শহর। বাস্তবিক এতটাই কাছে যে  মনে হয়  হাত বাড়ালেই বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ ছুঁয়ে ফেলা যাবে । পেলিং-এর আবহাওয়া আগে থেকে বোঝা অসম্ভব। এই মেঘ বৃষ্টি আর এই আবার ঝলমলে রৌদ্র। কখনও  ঘন কুয়াশা এসে জড়িয়ে ধরবে আবার তার পরক্ষণেই বিদায় জানাবে। আমাদের সৌভাগ্য, যে সময় গিয়েছিলাম তখন প্রতিদিন  আকাশ পরিষ্কার। সারাদিনই সমগ্র গিরিশ্রেণী আমাদের চোখে ধরা দেয় অকৃপণভাবে।

 

কাঞ্চনজঙ্ঘা জলপ্রপাত
কাঞ্চনজঙ্ঘা জলপ্রপাত

পেলিং জায়গাটি তিন ভাগে বিভক্ত। লোয়ার পেলিং, মিডল্ পেলিং আর আপার পেলিং। ভাগগুলি আসলে পাহাড়ের তিনটি ধাপ। একদম উপরে আপার, তার নীচে মিডল্ আর তার নীচে লোয়ার পেলিং। আমরা ছিলাম লোয়ার পেলিং-এ। সারা পেলিং জুড়েই  পর্যটকের ভিড় বেশি। সিজনে গেলে আগাম বুকিং না থাকলে হোটেল পাওয়া মুশকিল। বেশিরভাগ হোটেলের অবস্থান এতটাই ভাল যে রুমের বিছানায় শুয়েই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। পেলিং থেকে বেশ কয়েকটি সুন্দর স্পট ঘোরা যায়। 

প্রথমেই গেলাম খেচিপেরি হ্রদ । বৌদ্ধ ও হিন্দু, উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই অতি পবিত্র এই হ্রদ নাকি মনোবাঞ্ছা পূরণ করে । পেলিং থেকে ৩১ কিলোমিটার দূরে এই অপূর্ব লেক “খেচিপোখরি লেক” বা “খেচিপেরি লেক” নামেই পরিচিত। বৌদ্ধ ধর্মগুরু পদ্মসম্ভবার আশীর্বাদ ধন্য চারিদিকে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা এই লেক হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে খুবই পবিত্র। বলা হয়ে থাকে এই লেকের সামনে দাঁড়িয়ে লেকের জল গায়ে ছিটিয়ে কোনো মনস্কামনা করলে নাকি তা পূর্ণ হয়ে থাকে।  জলাশয়ের জল খুবই স্বচ্ছ আর পরিষ্কার। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, লেকের চারপাশে প্রচুর গাছ থাকা সত্ত্বেও লেকের জলে কোনও পাতা পড়ে থাকতে দেখা যায় না। কারণ যদি কোনও পাতা কখনও হাওয়ায় উড়ে এসে এই জলাশয়ের জলে পড়ে তৎক্ষণাৎ কোনও না কোনও পাখি এসে সেই পাতা ঠোঁটে করে তুলে নিয়ে চলে যায়।  যদিও গাছের কোনও পাতা লেকের জলে পড়ে ছিলো না। 

 ভিউ পয়েন্ট থেকে লেকের আকার পায়ের পাতার ছাপের মত। শোনা যায়  এই ছাপ মহাদেবের পায়ের। লেকের জলে অসংখ্য বড় বড় মাছ রয়েছে। লেকে যাওয়ার মুখে অনেক দোকান আছে যেখান থেকে ছোটো বড় সয়াবিনের প্যাকেট কিনতে পাওয়া যায় ওই মাছেদের খাওয়ানোর জন্য। এ মাছ ধরা বা খাওয়া হয় না। লেকের ধারে  হাওয়ায় উড়তে থাকা রঙবেরঙের বৌদ্ধ পতাকাগুলি দেখতে দারুণ। লেক আর  চারিদিকের ভিউ সারাজীবন মনে থাকার মতো।

এছাড়া এখানে দেখার মত আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা জলপ্রপাত, স্কাই ওয়াক ধরে বোধিসত্ত্ব চেনরেজিগের একটি সুবিশাল মূর্তি, দরোপ গ্রাম,  রিম্বি ঝর্ণা, পুরানো রাজধানী ইয়াকসাম। অপূর্ব নৈসর্গিক প্রাকৃতিক শোভার মাঝে কয়েকটা দিন কাটানোর জন্য পেলিং আদর্শ গন্তব্য হতে পারে।

কীভাবে যাবেন : শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গাড়ি বুক করে সরাসরি পেলিং। শেয়ার জিপে জোরথাঙ পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে আবার শেয়ার জিপে পেলিং পৌঁছানো যায়। অথবা গ্যাংটক থেকে গাড়ি নিয়ে  নামচি, রাবাংলা হয়ে পেলিং। মনে রাখবেন, পশ্চিম সিকিম ধসপ্রবণ অঞ্চল, পথে মাঝে মাঝেই ধস নামে। বড় ধস না হলে কিছুক্ষণের মধ্যে রাস্তা পরিষ্কার করে যানবাহন চলা শুরু হয়। 

কোথায় থাকবেন : পেলিংয়ে সর্বত্র নানা মানের হোটেল আছে। ভাড়া আপার পেলিংয়ে বেশি, লোয়ারে কম। পর্যটকের ভিড় বেশি। আগে থেকে বুক করে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সিজ়ন ভেদে রেট নামাওঠা করে। পেলিং দার্জিলিংয়ের থেকে উঁচুতে। ঠান্ডা বেশি। উচ্চতাজনিত শারীরিক সমস্যা হতে পারে। 



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Enable Notifications OK No thanks