সন্দীপ সরকার, কলকাতা: বাংলার ক্রিকেটে বিতর্ক থামার ইঙ্গিতই নেই যেন। এবার সিএবি-র বার্ষিক সাধারণ সভায় ‘রাজনৈতিক প্রভাব’ খাটিয়ে রিগিংয়ের অভিযোগ তুলল নদিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থা। বলা হল, জেলা ক্রীড়া সংস্থার মনোনীত প্রতিনিধির ফর্ম জমাই নেওয়া হয়নি! অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে সিএবি-র এজিএমে নদিয়া জেলার প্রতিনিধিত্ব করেন নদিয়া জেলার অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা এডিএম।
এর আগে সিএবি-র বার্ষিক সাধারণ সভায় মনোনয়ন জমা দেওয়া ও জেলার প্রতিনিধিত্ব করা নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো ও বলপূর্বক মনোনীত প্রতিনিধি বদলে দেওয়ার অভিযোগ তুলে বোমা ফাটিয়েছিল মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থা। বলা হয়েছিল, ‘রাজনৈতিক প্রভাব’ খাটিয়ে গত সিএবি নির্বাচনে মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরা। যিনি জমি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে গ্রেফতার হয়েছেন। সিএবি-র অস্বস্তি বাড়িয়ে। মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সচিব সঞ্জিৎ তরোই অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর নিজের নাম প্রতিনিধি হিসাবে পাঠানো হলেও সিএবি-র হেডক্লার্ক বিশ্বপতি সেন সেই ফর্ম নিতে অস্বীকার করেন। সঞ্জিতের অভিযোগ ছিল, তাঁর প্রতিনিধিকে সিএবির হেড ক্লার্ক বলেন যে, রেজোলিউশন লেটার বা সংস্থার অঙ্গীকারপত্র না দিলে ফর্ম জমা হবে না। এ-ও অভিযোগ, পরে মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার বৈঠকে তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরা জানান, খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি তাঁকে সিএবি এজিএমে যেতে বলেছেন। সেই মতো বদলে যায় মনোনয়নপত্র।
পরে সিএবি থেকে বিবৃতি দিয়ে সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল বটে, তবে হেডক্লার্ক যে ফর্ম জমা নেননি, এক্তিয়ার বহির্ভূত কাজ হিসাবে নথি যাচাই করেছিলেন, সেটা ঘুরিয়ে মেনে নেওয়া হয়। ইলেক্টোরাল অফিসার ছাড়া যে কাজ আর কারও করার কথা নয়। সেই সময়কার সিএবি প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ও এবিপি লাইভ বাংলাকে বলেছিলেন, ‘নিয়ম নেই জানি, তবে সদস্যদের স্বার্থের কথা ভেবেই হয়তো এটা করেছিল বিশ্বপতি সেন। যাতে সব সংস্থার প্রতিনিধিত্ব থাকে।’
এবার মেদিনীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার পথে হেঁটে বোমা ফাটাল নদিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থা। নদিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি আলাপন চট্টোপাধ্যায় দাবি করলেন যে, তাঁদের পক্ষ থেকে অর্ধেন্দু ঘোষকে গত বছরের সিএবি এজিএমে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, তৎকালীন ডিএম সেই সিদ্ধান্ত না মেনে ‘বলপূর্বক’ এডিএমকে সিএবি-র বার্ষিক সাধারণ সভায় নদিয়া জেলার প্রতিনিধিত্ব করতে পাঠিয়ে দেন! এও অভিযোগ করা হল যে, এমন ‘আতঙ্কের’ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যাতে অর্ধেন্দুর নাম বাদ দিতে বাধ্য হয় নদিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থা! যদিও এরপরেও জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে অর্ধেন্দুর নাম পাঠানো হয় সিএবি-র কাছে। সিএবি নাকি সেটা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।
নদিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি আলাপন চট্টোপাধ্যায় বললেন, ‘গত বছর সিএবি বার্ষিক সাধারণ সভার সময় আমরা অর্ধেন্দু ঘোষকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠাতে চেয়েছিলাম। সিএবি প্রতিনিধিত্ব কে করবেন, সেটা ঠিক করেন আমাদের জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যরা। সেই অনুযায়ী অর্ধেন্দু ঘোষের যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময়কার ডিএম আমাদের রেজোলিউশনকে মান্যতা না দিয়ে বলপূর্বক এডিএমকে পাঠিয়েছিলেন। আমরা পরে মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে অর্ধেন্দুর নাম পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সিএবি সেটা গ্রহণ করেনি। বরং এডিএমকে অ্যাকসেপ্ট করা হয়। তাহলে কি সেক্ষেত্রে সিএবি রেজোলিউশন চায়নি? তা না হলে অনৈতিক কাজকে সমর্থন করেছিল।’
গোটা ঘটনা শুনে ভারতীয় ক্রিকেটের হাল হকিকত জানেন, এমন সকলেই বিস্মিত। কারণ, সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত লোঢা কমিটির সুপারিশ মেনে বোর্ড ও সমস্ত রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার সংশোধিত গঠনতন্ত্রে বলা আছে, সরকারি কর্মচারীর নাম কখনওই ক্রিকেট সংস্থার নির্বাচনে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো যায় না। এডিএম তো সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মী! বলা হচ্ছে, লোধা আইনকে অস্বীকার করা হলে সিএবি নির্বাচনের বৈধতাই বা থাকে কী করে?
সিএবি অবশ্য দায় নিজেদের ঘাড়ে নিতে নারাজ। সিএবি-র কোষাধ্যক্ষ তথা প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সেনাপতি সঞ্জয় দাস এবিপি লাইভ বাংলাকে বলছিলেন, ‘যে কোনও জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রধান হচ্ছেন ডিএম। তিনি যদি কাউকে মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে বার্ষিক সভায় পাঠান, আর সেই প্রতিনিধি যদি হন এডিএম, সেখানে সিএবি-র কী করার থাকতে পারে? এঁরা সকলেই উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মী। আমি সেই সময় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ ছিলাম না। তবে ডিএম যদি কাউকে পাঠিয়ে থাকেন, তা হলে সেটাকে তো মান্যতা দিতেই হবে।’
উদাহরণও দিলেন সঞ্জয়। বললেন, ‘সিএবি প্রেসিডেন্ট যদি কাউকে চিঠি দেন, আর আমিও দিই, তাহলে কার চিঠি মান্যতা পাবে? অবশ্যই সিএবি প্রেসিডেন্টের চিঠি। কারণ সেটাই হায়েস্ট চেয়ার। সেরকমই, ডিএম কাউকে মনোনীত করলে সেটাই শেষ কথা। বাকিটা সিএবি ইলেক্টোরাল অফিসারের এক্তিয়ার। তিনি যেটা ঠিক মনে করেছিলেন, করেছেন। এক্ষেত্রে সিএবি-র কিছু করণীয় নেই।’
ঘটনা হচ্ছে, সিএবি-র ইলেক্টোরাল অফিসার সুশান্ত রঞ্জন উপাধ্যায়কে নিয়ে শুক্রবার অ্য়াপেক্স কাউন্সিলের বৈঠকেই প্রশ্ন উঠেছিল। তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ই-মেলও গিয়েছে সিএবিতে।
আরও পড়ুন: সিএবি ছেঁটে ফেলেছে, বড় দায়িত্ব দিল BCCI, ‘যোগ্যতার মাপকাঠিতে বাদ পড়িনি’, বলছেন সৌরাশিস
FIFA World Cup 2026: ফুটবল বিশ্বকাপে এবার ‘স্মার্ট বল’ Trionda, এই বল নিয়ে কেন এত মাতামাতি?
