June 17, 2026
c91508f95a3934d7590b6bd4be58f406178171402707550_original.jpg
Spread the love


সন্দীপ সরকার, কলকাতা: একটা চিঠি। আর সেটাই যেন পত্রবোমা হয়ে আছড়ে পড়েছে ময়দানে। নড়েচড়ে বসেছে বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা সিএবি। রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁকে উদ্দেশ্য করে লেখা যে পত্রে সিএবি-র নাম উল্লেখ করা হয়নি। অথচ ক্রীড়ামন্ত্রীর কাছে তারই জবাবি চিঠি দিয়ে এলেন সংস্থার পদাধিকারীরা!

সিএবি-র প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট তথা আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের এক সময়কার সদস্য অভিষেক ডালমিয়া ইন্দ্রনীল খাঁকে চিঠি লিখে অভিযোগ করেন, ময়দানের এক ‘স্বনামধন্য’ ক্রীড়া সংস্থায় নানা দুর্নীতির কালি ছিটিয়েছে। টাকার বিনিময়ে খেলোয়াড়দের সুযোগ করে দেওয়ার মতো গুরুতর দুষ্কর্ম ঘটছে বলেও বোমা ফাটান তিনি। তার চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেন, দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবাদ বা অভিযোগ করলে সঠিক তদন্ত হয় না। বরং অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া হয়। ক্রীড়ামন্ত্রীর কাছে অভিষেক আবেদন করেন, একটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হোক। যেখানে খেলোয়াড়, তাঁদের পরিবারের সদস্য, ময়দানের শুভানুধ্যায়ীরা পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানাতে পারবেন। তিনি সিএবি প্রশাসনে থাকার সময় যে দুর্নীতির সঙ্গে আপোসহীন ছিলেন, সেটাও চিঠিতে লেখেন অভিষেক। ক্রীড়ামন্ত্রীকে পাঠানোর পাশাপাশি চিঠিটি সোশ্যাল মিডিয়াতেও পোস্ট করেন কিংবদন্তি ক্রিকেট প্রশাসক, প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়ার পুত্র।

অভিষেকের উল্লেখ করা ‘স্বনামধন্য’ ক্রীড়া সংস্থা কি সিএবি? নানা অনিয়মের অভিযোগে বিদ্ধ বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই কি প্রশ্ন তুলেছেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট? এ নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়।

তবে বুধবার অভিষেকের জবাবি চিঠি ক্রীড়ামন্ত্রীকে দিয়ে এলেন সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাসেরা। বকলমে যেন এ-ও মেনে নিলেন যে, সিএবি-র দিকেই আঙুল তুলেছেন অভিষেক।

ক্রীড়ামন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে চিঠিটি লিখেছেন সিএবি-র পদাধিকারীরা। যে চিঠির প্রতি ছত্রে ছত্রে রয়েছে সাফাই ও পাল্টা মিসাইল নিক্ষেপ। লেখা হয়েছে, ‘আমরা, সিএবি পদাধিকারীরা এই চিঠি লিখছি বাংলায় ক্রিকেটের স্বচ্ছতা, বিশ্বাসযোগ্যতা আর উন্নয়নের প্রতি আমাদের অটল অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে। আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, এ রাজ্যের তরুণদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ ক্রিকেট প্রশাসনের তরফে সুরক্ষিত। বৈধ নজরদারির আওতাভুক্ত।’

এরপরই অভিষেকের চিঠির প্রসঙ্গ তুলে একের পর এক বোমা ফাটিয়েছেন সিএবি আধিকারিকরা। লেখা হয়েছে, ‘১৩ জুন সিএবির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট অভিষেক ডালমিয়া সোশ্যাল মিডিয়ায় যে চিঠি পোস্ট করেন এবং তার ভিত্তিতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যে খবর করে, সেখানে দল নির্বাচনে স্বচ্ছতা, দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় নিয়ে একটা ধারণা পোষণ করা হয়েছে। ফুটবল, হকি সহ গোটা ময়দানে কী হচ্ছে বলতে পারব না, তবে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে গঠিত লোঢা কমিটির সুপারিশ মেনে সংশোধিত গঠনতন্ত্রের দিকে আপনার (ক্রীড়ামন্ত্রীর) দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। যে গঠনতন্ত্র ভারতীয় বোর্ড এবং অনুমোদিত সব সংস্থা মেনে চলে। সেই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রত্যেক সংস্থার একজন করে ওম্বাডসম্যান ও এথিক্স অফিসার থাকেন। হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতিদের সেই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য গত দু’বছর ধরে ওম্বাডসম্য়ানের দায়িত্বে আছেন এবং এখন তিনি এথিক্স অফিসারও।’

সিএবি থেকে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, ‘যে কোনও অভিযোগ এলে আইনি পবিত্রতা, নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং পদাধিকারীদের হস্তক্ষেপ-মুক্তভাবে তা দেখা হয়। কোনও অ্যাথলিট, কোচ, অভিভাবক বা প্রশাসক নথি প্রমাণাদি সহ অভিযোগ সরাসরি ওম্বাডসম্যানকে জানাতে পারেন। গত ৩০ বছর ধরে বিশ্বনাথ দত্ত, জগমোহন ডালমিয়া, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, অভিষেক ডালমিয়া ও স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব সিএবি প্রেসিডেন্ট থেকেছেন। বাবলু কোলে, বিশ্বরূপ দে, বাবলু গঙ্গোপাধ্যায় (সুবীর) সচিব পদে আছেন বা থেকেছেন। কখনও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কিংবা অবক্ষয়ের অভিযোগ ওঠেনি। যদিও বিস্ময়করভাবে সাম্প্রতিক চিঠিতে বোঝানো হয়েছে, শুধু তাঁর (অভিষেক ডালমিয়ার) আমল ছাড়া সব সময়ই অস্বচ্ছতা ছিল।’

সিএবি পদাধিকারীদের পাঠানো চিঠিতে পাল্টা অভিযোগ, ঘটনার অপব্য়াখ্যা করা হচ্ছে। সিএবির কোনও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট কিংবা সচিব এই ধরনের চিঠি জনসমক্ষে লেখেননি। সংস্থার সকলেই যা দেখে হতবাক বলে অভিযোগ সিএবির।

এখানেই শেষ নয়, ক্রীড়ামন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে, তিনি যেন সশরীরে এসে ১৪০ জন সদস্যের সঙ্গে কথা বলেন। সৌরভ জাতীয় দলের অধিনায়কই শুধু ছিলেন না, বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, আইসিসি ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন, তাঁর স্বচ্ছতা নিয়ে কখনও প্রশ্ন ওঠেনি। বি এন দত্ত, জগমোহন ডালমিয়াদের বিরুদ্ধেও সেরকম অভিযোগ ওঠেনি। তাই শুধু একটা মেয়াদকালই পরিচ্ছন্ন দাবি করাটা মেনে নেওয়া যায় না।

বলা হয়েছে, হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি যখন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্বে, তখন জনসমক্ষে এমন চিঠি পোস্ট করে সঠিক আইনি পথে এগিয়ে সুরাহার খোঁজ করার বদলে শুধু ক্রীড়া প্রশাসনের সমস্যা জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। অথচ সচিব ও প্রেসিডেন্ট হিসাবে ২০২২ সাল পর্যন্ত তাঁর মেয়াদকালে নাকি এমন কোনও সমস্যা, অভিযোগ ছিল না। সিএবি-র চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘দুর্নীতিবিরোধী হেল্পলাইন খোলার ব্যাপারে বলব, এটা সিএবিও চায়। ওম্বাডসম্যান এগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। আপনাকে অনুরোধ যত দ্রুত সম্ভব হটলাইন চালু করুন এবং ওপরের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখুন।’

চিঠির শেষে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার মতো করেই সিএবি লিখেছে, ‘কেন ঠিক এই সময়ে জনগণের মনে একটা ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করা হল, সেটাও যাচাই করে দেখা হোক।’ সিএবি-র আসন্ন নির্বাচনের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে, মনে করছে ময়দান।

তবে চিঠি নিয়ে পাল্টা প্রশ্নও উঠছে।

এক, অভিষেক সরাসরি নাম না করলেও কেন সিএবি-ই তাঁর নিশানায় ধরে নেওয়া হল? যেখানে অভিষেক চিঠিতে গোটা ময়দানের দুর্নীতি নিয়েই সরব হয়েছেন। অভিষেক ঘনিষ্ঠ সিএবি-র কেউ কেউ তো বলতে শুরু করেছেন যে, এ যেন ‘ঠাকুরঘরে কে, আমি তো কলা খাইনি’র মতো পরিস্থিতি।

দুই, ১৭ জুন লেখা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, সহ সভাপতি নীতীশরঞ্জন দত্ত, কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাস, সচিব বাবলু কোলে। সেই সঙ্গে সই করেছেন মদনমোহন ঘোষ, চিঠিতে যাঁর পরিচয় দেওয়া হয়েছে প্রাক্তন যুগ্মসচিব হিসাবে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, সত্তরোর্ধ্ব মদন ঘোষকে যখন বহু বিতর্কের পর সরিয়েই দিচ্ছে সিএবি, বিশেষ সাধারণ সভার দিনক্ষণ ঠিক করতে ১৭ জুন অ্যাপেক্স কাউন্সিলের বৈঠক যখন ডাকা হয়েছে, এবং সর্বোপরি যখন প্রাক্তন হিসাবে পরিচয় দেওয়া হচ্ছে, তখন মদন ঘোষ এই চিঠিতে সই করলেন কীভাবে! তাহলে তো বিশ্বরূপ দে, সুবীর গঙ্গোপাধ্যায়, নরেশ ওঝাদেরও সই নেওয়া উচিত ছিল।

তিন, যদি প্রাক্তনই হয়ে যান, তাহলে এখনও পর্যন্ত সিএবি-তে যুগ্মসচিবের ঘর আলো করে, নেমপ্লেট লাগিয়ে চেয়ারে বসছেন কীভাবে মদন?

যুগ্মসচিব পদে নির্বাচন হওয়ার হাওয়া জোরাল। সেপ্টেম্বরে সিএবি-র বার্ষিক সাধারণ সভায় সচিব পদও খালি হচ্ছে। সেখানেও নির্বাচনের সমূহ সম্ভাবনা। নির্বাচনী অঙ্ক সাজাতেই কি ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে এই সাক্ষাৎ সৌরভ-সঞ্জয়দের?

অভিষেক যদিও সিএবি-র পত্রবোমা নিয়ে বুধবার কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি। ক্রীড়ামন্ত্রী তাঁর সঙ্গে আলাদা করে বসবেন বলে সাংবাদিকদের আগেই জানিয়েছেন। অভিষেকের সময়ও চেয়েছেন ইন্দ্রনীল খাঁ। অভিষেক পাল্টা কি ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করেন, দেখার অপেক্ষায় ময়দান।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Enable Notifications OK No thanks