নয়াদিল্লি: একটু একটু করে উত্তাপ বাড়ছিল। শেষে শনিবার ভোররাতে আক্রমণ। ভেনিজুয়েলায় বোমা বর্ষণ আমেরিকার। বন্দি করা হল দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে। বেশ কিছু দিন ধরেই আমেরিকার সঙ্গে সংঘাত বাড়ছিল আমেরিকার। ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে পর পর ভেনিজুয়েলার জাহাজও ধ্বংস করেছে তারা। এয়ার স্ট্রাইকও চালানো হয়েছে ভেনিজুয়েলায়। তবে এদিন একেবারে পরিকল্পিত ভাবে অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু এতদূর জল গড়াল কেন? কেনই বা ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ চালাল আমেরিকা? (US Attacks Venezuela)
ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে বেশ কিছু দিন ধরেই কড়া মনোভাব প্রকাশ করে আসছিলেন ট্রাম্প। বিশেষ করে বেআইনি অভিবাসন, মাদক কারবার এবং নার্কো-সন্ত্রাস চালানোর অভিযোগ উঠছিল। ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল, দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে বেআইনি ভাবে আমেরিকায় প্রবেশ করছেন অভিবাসীরা। আমেরিকার সরকারের একটি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সাল থেকে হিসেব করলে, ভেনিজুয়েলা থেকে পালিয়ে এসেছেন ৮০ লক্ষ মানুষ। (Donald Trump vs Nicolas Maduro)
আমেরিকা সরকারের দাবি, ভেনিজুয়েলায় যে অর্থনৈতিক সঙ্কট নেমে এসেছে, সেখানে রাজনৈতিক শোষণ যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতেই মানুষজন দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন। ট্রাম্প সরাসরি মাদুরোকে কাঠগড়ায় তোলেন। তাঁর দাবি ছিল, জেলখানা, অ্যাসাইলাম, সব খালি করে দিচ্ছেন মাদুরো। সকলকে আমেরিকায় ঠেলে পাঠাচ্ছেন তিনি।
পাশাপাশি, আমেরিকায় বেআইনি ভাবে কোকেন ঢোকানোর জন্যও ভেনিজুয়েলাকে কাঠগড়ায় তোলেন ট্রাম্প। এমনকি Fentanyl সঙ্কটের জন্যও মাদুরোকে দায়ী করেন তিনি। মাদুরোকে তিনি ‘নার্কো-সন্ত্রাসী’ বলে আক্রমণ করেন। জাহাজে মালবোঝাই করে তিনিই আমেরিকায় কোকেন, Fentanyl ওষুধ ঢোকাচ্ছেন বলে অভিযোগ ট্রাম্পের। গত ১৫ ডিসেম্বর একটি নির্দেশিকা জারি করেন ট্রাম্প, যাতে Fentanyl-কে তিনি ‘Weapon of Mass Destruction’ বলে উল্লেখ করেন। যদিও DEA, UNODC-র রিপোর্ট বলছে, Fentanyl মূলত মেক্সিকোতেই তৈরি হয়। রাসায়নিক আসে চিন থেকে। ভেনিজুয়েলার মাধ্যমে কোকেন পাচার হয় ইউরোপে।
ভেনিজুয়েলা এবং মাদুরো যদিও গোড়া থেকেই যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধে’র নামে আসলে ভেনিজুয়েলায় ক্ষমতায় রদবদল ঘটাতে চাইছে আমেরিকা। আমেরিকার হাতে বন্দি হওয়ার আগে গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে শান্তির বার্তাও দেন মাদুরো। কিন্তু তার ৪৮ ঘণ্টা পরই আমেরিকার হাতে সস্ত্রীক বন্দি হলেন তিনি। আমেরিকাতেই তাঁর বিচার হবে বলে জানা যাচ্ছে।
ওই সাক্ষাৎকারে মাদুরো বলেন, “আমাদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে, সেই মতো আলোচনায় বসতে হবে। মাদক পাচার চক্র নিয়ে আমরাও কথা বলতে চাই। আর ওরা যদি ভেনিজুয়েলার তেল চায়, তাহলে ওদের বিনিয়গের প্রস্তাব খতিয়ে দেখা হবে। তাঁরা যেভাবে চাইবেন, সেভাবেই হবে। ওরা আসলে চায় কী? একটা বিষয় স্পষ্ট, হুমকি, ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে জোর করে চাপিয়ে দিতে চায় ওরা।”
ভেনিজুয়েলায় বিপুল পরিমাণ তেল মজুত রয়েছে। কিন্তু সৌদি আরবের মতো সেই তেলের সার্বিক বাণিজ্যিকীকরণ ঘটেনি। বেশ কিছু সংস্থা সেখানে সক্রিয় থাকলেও, নিষেধাজ্ঞার জেরে তেমন বড় বিনিয়োগ ঘটেনি ভেনিজুয়েলায়। তবে ভেনিজুয়েলার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কেনে চিন। আবার ভেনিজুয়ালের মাটিতে বিপুল বিরল খনিজ সম্পদও মজুত রয়েছে। চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে যেখানে সুসম্পর্ক রয়েছে ভেনিজুয়েলার। আমেরিকার সঙ্গে বিরোধই চোখে পড়েছে। সেই নিয়েও ট্রাম্প মাদুরোর উপর খাপ্পা ছিলেন বলে মত Tulane University-র ভেনিজুয়েলা বিশেষজ্ঞ ডেভিড স্মাইল্ডের। কারণ শুধু চিন বা রাশিয়া নয়, ইরানের সঙ্গেও শক্তি উৎপাদন ও খনিজ সম্পদ বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল ভেনিজুয়েলা।
সেই আবহেই সম্প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন ট্রাম্প। ১৯ শতকের Monroe Doctrine-এর উল্লেখ করে পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার প্রতিপত্তি ও প্রভাবের উপর জোর দেন। লাতিন আমেরিকা তো বটেই, ইউরোপের একাধিক দেশও বিষয়টি ভাল ভাবে নেয়নি। সেই নিয়ে কাটাছেঁড়া চলাকালীনই গত কয়েক সপ্তাহে লাতিন আমেরিকায় আরও বেশি সংখ্যায় সেনা মোতায়েন করে আমেরিকা। ভেনিজুয়েলায় মাদুরো সরকারের বৈধতাও অস্বীকার করেন ট্রাম্প। ২০১৩ সাল থেকে সেখানে ক্ষমতায় ছিলেন মাদুরো। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠলেও, টলানো যায়নি মাদুরোকে।
সেই অবস্থায় গত বছর অক্টোবরে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কার্যত ফুঁসে ওঠেন মাদুরো। দেশে ‘গৃহযুদ্ধ’ ঘটিয়ে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলায় পালাবদল ঘটাতে চাইছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। মাদুরের দাবি ছিল, তাঁর জন্যই ভেনিজুয়েলার তেল ও বিরল খনিজ সম্পদের নাগাল পাচ্ছে না আমেরিকা। তাই তাঁকে হটাতে মিথ্যে অভিযোগ তুলছেন ট্রাম্প। যেভাবে সাগরে ভেনিজুয়েলার নৌকা, জাহাজে আক্রমণ চালায় আমেরিকা, তারও নিন্দা করেন মাদুরো। শতাধিক মানুষের মৃত্যু কেন আগ্রাসন বা খুন বলে গণ্য হবে না, প্রশ্ন তোলেন। গত ১৬ অক্টোবর একটি বার্তায় মাদুরো ইংরেজিতে বলেন, “Not War, Yes Peace. The people of US, Please”.
মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে যেভাবে বন্দি করেছে আমেরিকা, তাতে ইতিমধ্যেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চিন, রাশিয়া-সহ একাধিক দেশ। ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে এগিয়ে এসেছে তারা। কিন্তু মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীর ভাগ্যে কী আছে, তা আমেরিকাই বিচার করবে। আমেরিকার অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি জানিয়েছেন, নিকোলাস ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে অপরাধ মামলা দায়ের হয়েছে। সেই আমেরিকায় বিচার হবে তাঁদের। প্যাম সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, নিকোলাসের বিরুদ্ধে নার্কো-সন্ত্রাস ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানি ষড়যন্ত্র, মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র মজুত, আমেরিকার বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক মেশিনগান ও ডিভাইস মজুত করার মামলা হয়েছে।
Input By : https://bengali.abplive.com/news/world-reacts-as-us-attacks-venezuela-captures-nicolas-maduro-donald-trump-us-faces-backlash-1163750
