সন্দীপ সরকার, কলকাতা: ভাল কাজ করলে প্রোমোশন যে কোনও চাকরির শর্ত বলেই মনে করা হয়। অথচ সেই ভাবনার গোড়ায় কুঠারাঘাত করার চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা সিএবি-তে!
সাম্প্রতিককালে পুরুষদের ক্রিকেটে বাংলার সবচেয়ে সফল কোচ সৌরাশিস লাহিড়ীকে (Saurasish Lahiri) আসন্ন মরশুমে সিনিয়র, অনূর্ধ্ব ২৩, অনূর্ধ্ব ১৯ কিংবা অনূর্ধ্ব ১৬ – কোনও দলের কোচিং প্যানেলেই নাও রাখা হতে পারে বলে সিএবি সূত্রে খবর। কোন দলের কোচ কে হবেন, তা এখনও চূড়ান্ত নয়। তবে ইন্টারভিউ পর্বের পর প্রাথমিকভাবে একটা তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে সৌরাশিসের নাম নেই বলেই খবর।
যা জানাজানি হতেই ময়দানে বিস্ময়ের বাতাবরণ। যে সৌরাশিস সদ্য বেঙ্গালুরুতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সেন্টার অফ এক্সেলেন্সে কোচ হিসাবে শিবির করে এলেন ভি ভি এস লক্ষ্মণ-ওয়াসিম জাফরদের সঙ্গে, তাঁকে রাজ্য ক্রিকেট সংস্থাতেই উপেক্ষার শিকার হতে হবে, বিশ্বাসই হচ্ছে না অনেকের।
সিএবি-র প্রাথমিক সেই তালিকার খবর সৌরাশিসের কানে পৌঁছয়নি বললে এ-ও বিশ্বাস করতে হয় যে, আমেরিকা-ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের কোনওদিন যুদ্ধই বাঁধেনি। বার্লিনের প্রাচীর এখনও অটুট। কিংবা, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদল হয়নি। সৌরাশিস যে এই উপেক্ষায় কতটা যন্ত্রণাবিদ্ধ, তার আভাস মিলেছে প্রাক্তন অফস্পিনারের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে। সৌরাশিস লিখেছেন, ‘কেউ কেউ আমার নীরবতা আর ধৈর্যকে দুর্বলতা ভেবে ভুল করছেন। তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঝড় ওঠে নিস্তব্ধতা থেকেই। আমি হয়তো শান্ত, কিন্তু দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আমি এমন দাবানলে পরিণত হতে পারি যা সবকিছু ছারখার করে দেওয়ার আগে সতর্ক হওয়ার সুযোগও দেবে না।’ যে ক্ষোভকে সঙ্গত বলে মনে করছে সিএবি-রই বড় একটা অংশ।
রেকর্ডবুক বলছে, তিন বছর বাংলার সিনিয়র দলের কোচ ছিলেন সৌরাশিস। তাঁর আমলে একবার রঞ্জি ফাইনাল ও একবার সেমিফাইনালে খেলেছে বাংলা। অনূর্ধ্ব ২৩ দলের কোচ হিসাবে ৩ বছর দায়িত্বে ছিলেন সৌরাশিস। সেই সময় বাংলা ৩টি ফাইনালে খেলে এবং জাতীয় ওয়ান ডে টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়। ২ বছর অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচ থাকাকালীন তাঁর প্রশিক্ষণে বাংলা একবার ফাইনাল ও একবার সেমিফাইনালে খেলে। এছাড়া দলীপ ট্রফিতে পূর্বাঞ্চল দলের, অনূর্ধ্ব ১৯ চ্যালেঞ্জার্সে ইন্ডিয়া ডি দলের কোচ ছিলেন সৌরাশিস। কোচ হিসাবে তাঁর ট্র্যাক রেকর্ডও বাংলার বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের কোচ হওয়ার দৌড়ে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের চেয়ে ভাল।
অথচ আসন্ন মরশুমে বাংলার কোনও দলেই কোচ হিসাবে তাঁকে প্রাথমিকভাবে ভাবছে না সিএবি। সিনিয়র টিমের কোচ হিসাবে লক্ষ্মীরতন শুক্লর কথা ভাবা হয়েছে। সিএবি এখনও ঘোষণা করেনি বটে, তবে রাজ্যের বিজেপি বিধায়ক তথা মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ মঙ্গলবার দুপুরেই বাংলার সিনিয়র দলের কোচ হওয়ার জন্য লক্ষ্মীরতনকে অভিনন্দন জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন!
বাংলার কোচের পদপ্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য অরুণ লাল, কল্যাণ চৌধুরী ও দেবাঙ্গ গাঁধীকে নিয়ে তিন সদস্যের কমিটি তৈরি করা হয়েছিল। তাঁরা বিভিন্ন প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়ে সিনিয়র দলের কোচ হিসাবে লক্ষ্মীরতন শুক্ল, অনূর্ধ্ব ২৩ দলের কোচ হিসাবে ঋদ্ধিমান সাহা, অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচ হিসাবে মনোজ তিওয়ারি ও অনূর্ধ্ব ১৬ দলের কোচ হিসাবে অনুষ্টুপ মজুমদারের নাম সুপারিশ করেছেন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার শন টেট, মুম্বইয়ের সুরেন্দ্র ভাবে, বাংলার প্রাক্তন পেসার সাবির আলিকে সহকারী কোচ হিসাবে ভাবা হচ্ছে বলে খবর। যে খবর সবার আগে লিখেছিল এবিপি লাইভ বাংলা। কিন্তু সৌরাশিসের নাম কোথাও শোনা যাচ্ছে না। যা শুনে সিএবি-রই একাংশ বিস্মিত।
কেন সৌরাশিস ব্রাত্য? সিএবি-তে কান পাতলে চাঞ্চল্যকর সব যুক্তি শোনা যাচ্ছে। যেমন, সাক্ষাৎকার পর্বে সৌরাশিসের প্রেজেন্টেশন নাকি পছন্দ হয়নি তিন সদস্যের কমিটির। যদিও শোনা গেল, সৌরাশিস নিজে অত্যাধুনিক প্রেজেন্টেশন দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সিএবি-র চিফ এগজিকিউটিউ অফিসার নাকি তাঁকে জানান যে, প্রোজেক্টর বা স্ক্রিনে প্রেজেন্টেশনের বন্দোবস্ত করা হয়নি। তাহলে কীসের প্রেজেন্টেশন আর কেনই বা তা অপছন্দ হল? সদুত্তর নেই।
বলা হচ্ছে, অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচ থাকাকালীন নাকি সৌরাশিসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল কোচিং সাপোর্ট স্টাফ সঞ্জীব সান্যালের। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সৌরাশিসের সঙ্গে ওই সাপোর্ট স্টাফের সংঘাত একজন ক্রিকেটারকে নিয়ে। যে ক্রিকেটারকে ব্যক্তিগত পরিসরে কোচিং করাতেন সঞ্জীব। অভিযোগ, বাংলা দলের সঙ্গে ওই ক্রিকেটারকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন সঞ্জীব। দলে না থাকা সত্ত্বেও। বলা হয়েছিল, তা নাহলে নাকি ওই ক্রিকেটারের মন খারাপ হবে। তারই প্রতিবাদ করায় সৌরাশিসের বিরুদ্ধেই নালিশ করেন সঞ্জীব। ওই ক্রিকেটারও যে প্রভাবশালী, ময়দানে সকলেই জানেন।
সৌরাশিস মুখে কিছু বলছেন না। তাঁর সঙ্গে এ নিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সাড়া দেননি। তবে শোনা গেল, ঘনিষ্ঠমহলে তিনি জানিয়েছেন যে, গোটা ঘটনায় তিনি অপমানিত বোধ করছেন। কারও কারও আশঙ্কা, নীরবতা ভেঙে তিনি না কোনও বিবৃতি দিয়ে বসেন। তাতে সিএবি-র অস্বস্তি বাড়বে বৈকি!
বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, সৌরাশিসের ক্ষোভ টের পেয়ে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমেছেন স্বয়ং সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি নাকি নিজেই সৌরাশিসকে মেসেজ পাঠিয়েছেন। সেই সঙ্গে অধুনা সৌরভ-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ময়দানের নব্য ক্রিকেট কর্তা, সিএবি-র অ্যাপেক্স কাউন্সিলের সদস্য সুরজিৎ লাহিড়ী নাকি ফোন করে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছেন। সৌরাশিসকে নাকি বলা হয়েছে, অন্য কোনওভাবে তাঁকে কাজে লাগানোর চিন্তাভাবনা চলছে। বলা হয়েছে, কোচিং প্যানেল এখনও চূড়ান্ত নয়। তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হতেই পারে। এ-ও বলা হয়েছে, পুরোটাই নাকি পারমুটেশন-কম্বিনেশনের কথা ভেবে। যদিও বাংলার কোচ নির্বাচনে পারফরম্যান্স নাকি পারমুটেশন-কম্বিনেশন, কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সদুত্তর দিতে পারেননি ওই নব্য় কর্তা।
কোচ নিয়ে নাটকের পরবর্তী অধ্যায় কী হয়, দেখার অপেক্ষায় ময়দান। হয়তো চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করছেন সৌরাশিসও। তারপর…
