সন্দীপ সরকার, কলকাতা: বাংলার অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচ হিসাবে উপেক্ষিত হওয়ার পরই বোমা ফাটিয়েছিলেন সৌরাশিস লাহিড়ী (Saurasish Lahiri)। বাংলার প্রাক্তন অফস্পিনার জানিয়েছিলেন, নির্বাচকেরা সিন্ডিকেট তৈরি করে দলে ক্রিকেটার ঢোকানোর চেষ্টা করেছিলেন। সহকারী কোচ বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। সিএবি-ও অসহযোগিতা করেছিল। বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও রিভিউ মিটিং করা হয়নি। উল্টে, কোচিং প্যানেল থেকে বাদ পড়ার পর তাঁকে মুখ বন্ধ রাখতে বলে ফোন করেছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ ক্রিকেট কর্তা সুরজিৎ লাহিড়ী।
সৌরাশিসের বিস্ফোরক অভিযোগের পর শুক্রবার সিএবিতে এসে পাল্টা অভিযোগ করলেন বাংলার জুনিয়র নির্বাচকেরা। জুনিয়র নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্য়ান সৌমিত্র মজুমদার এবং বাকি চার সদস্য – প্রবীর আচার্য, শঙ্কর ভট্টাচার্য, সত্যেন ভট্টাচার্য ও প্রসেনজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় জানালেন, পছন্দের দলই পেয়েছিলেন সৌরাশিস। কোচ না হতে পেরে তাঁদের ওপর অন্যায়ভাবে দায় চাপাচ্ছেন।
শুক্রবার দুপুরের ঝড়বৃষ্টিতে কলকাতা তখন স্তব্ধ। ঝড় উঠেছে সিএবির অলিন্দেও। ক্লাব হাউসের দোতলায় বসে জুনিয়র নির্বাচক প্রবীর আচার্য বললেন, ‘অনূর্ধ্ব ১৯ পর্যায়ে আমরা ৫০ জনের প্রাথমিক দল বেছে দিয়েছিলাম। সেখান থেকে ৩০ জনের দল গঠন হয়। সেখানে কোচের মতামতও নেওয়া হয়েছিল। সেই ছেলেগুলিকে নিয়ে কোচ পুঁদুচেরি ও আমদাবাদে টুর্নামেন্ট খেলে। ম্যাচে কোন ক্রিকেটার খেলবে, কোন পোজিশনে খেলবে, সেটা কোচের সিদ্ধান্ত। আমরা নাক গলাই না।’
প্রধান নির্বাচক সৌমিত্র মজুমদার বললেন, ‘কেন আমাদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট চালানোর অভিযোগ করেছে সৌরাশিস, জানি না। এরকম অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’
সৌরাশিসের অভিযোগ, অগ্নিশ্বর দাসকে দলে নেওয়া নিয়ে জোরাজুরি করেছিলেন সহকারী কোচ সঞ্জীব সান্যাল। তাঁকে আমদাবাদে প্রস্তুতি টুর্নামেন্ট খেলতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জোর করে। এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে নির্বাচক সত্যেন ভট্টাচার্য বললেন, ‘অগ্নিশ্বর সাদা বলের ক্রিকেটে দারুণ ক্রিকেটার। আমাদের মনে হয়েছিল লাল বলের ক্রিকেটে ওকে সুযোগ দেওয়া হলে ভাল করবে। প্রস্তুতি ম্যাচে খেলালে ক্রিকেটার উপকৃত হতে পারত। আমরা মতামত জানিয়েছিলাম। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল কোচের হাতে ছিল।’
সৌরাশিস বলেছিলেন, শুধু সিদ্ধার্থ ঘোষ নামের এক ক্রিকেটারকে নেওয়ার জন্য আলাদা করে ট্রায়াল ম্যাচ করা হয়েছিল। সত্যেন ভট্টাচার্য বললেন, ‘ডালহৌসি ক্লাবে খেলে সিদ্ধার্থ। ওর পারফরম্যান্স দেখলেই বোঝা যাবে, দলে জায়গা প্রাপ্য।’ অনূর্ধ্ব ১৬ দলের সেরা বোলার আকাশ তরফদারকে উপেক্ষা করা হয়েছিল এই সিদ্ধার্থ ঘোষকে দলে নেওয়ার জন্য? নির্বাচক প্রবীর আচার্য বললেন, ‘ওই ছেলেটা (আকাশ) দলের সঙ্গে ঘুরছিল, কোনও ম্যাচ খেলেনি। আমাদের মনে হয়েছিল ও ক্লাব ম্যাচ খেললে ভাল হয়। সিদ্ধার্থ গত মরশুমে ভাল পারফর্ম করেছিল। তাই দলে নেওয়া। গোয়ার সঙ্গে ওকে খেলানো হয়নি।’ নির্বাচক শঙ্কর ভট্টাচার্য বললেন, ‘সিদ্ধার্থ উত্তর প্রদেশের বিরুদ্ধে ভাল বল করেছিল। স্যুইং করাচ্ছিল। একটা উইকেট পায়।’
কোনও প্লেয়ারকে দলে নেওয়ার জন্য কি প্রভাবশালী মহলের চাপ ছিল? অস্বীকার করলেন নির্বাচকেরা। পাল্টা বললেন, ‘কোচ পরিবার নিয়ে দলের সঙ্গে ট্যুরে গিয়েছে। ট্রেনার অঙ্কুর চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিল বলে ও ইস্তফা দেয়।’ সৌরাশিসের অভিযোগ ছিল, উত্তর প্রদেশ ম্য়াচের দল নির্বাচনী বৈঠক তাঁকে ছাড়াই করা হয়। যদিও সেই অভিযোগ মানছেন না নির্বাচকেরা। বললেন, ‘বাংলা দলের ম্যাচ ছিল বলে কল্যাণীতে ছিল সৌরাশিস। ফোনে ওর সঙ্গে কথা বলা হয়।’ সেটা নির্বাচনী বৈঠকের আগে না পরে? নির্বাচকেরা বললেন, ‘আগেই ফোন করেছিলেন সিএবি যুগ্মসচিব মদন ঘোষ।’ সেই মদন ঘোষ, বয়স ৭০ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর যিনি সুপ্রিম কোর্টের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বহাল তবিয়তে রোজ সন্ধ্যায় সিএবিতে নিজের ঘরে বসে থাকছেন।
যদিও এমন কিছু প্রশ্ন উঠছে, যা নির্বাচক ও সিএবি-র অস্বস্তি বাড়াচ্ছে বৈকি!
এক, নির্বাচকেরা কি বাংলার খেলা দেখতে মাঠে যান? বোর্ডের অনূর্ধ্ব ১৬ টুর্নামেন্ট বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিতে বাংলা দলের সঙ্গে গিয়েছিলেন? নির্বাচকেরা জানালেন, প্রবীর আচার্য দলের সঙ্গে যান। বাকিদের নাকি লম্বা সফরে কলকাতার বাইরে যাওয়ায় সমস্যা রয়েছে। কিন্তু পাঁচ সদস্যের নির্বাচক কমিটির বাকিরা তাহলে বোর্ডের ম্যাচ দেখেন কীভাবে?
দুই, অনূর্ধ্ব ১৬ টুর্নামেন্টের খোঁজখবর কি জুনিয়র নির্বাচকেরা রাখেন? প্রশ্ন করা হল, গত মরশুমে বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কোন দল? সকলে আমতা আমতা করলেন। এ-ওর মুখের দিকে চাইলেন। তারপর গুগল ঘেঁটে উত্তর বার করলেন। বোর্ডের জুনিয়র ক্রিকেটের টুর্নামেন্টের খোঁজ রাখেন না জুনিয়র নির্বাচকেরাই? নির্বাচকেরা বিস্ময়করভাবে বললেন, ‘আমরা শুধু বাংলা দলের খোঁজ রাখি।’
তিন, বাংলার বিভিন্ন জুনিয়র দলের কোচ নিয়োগ করার আগে কি সিএবি তাঁদের মতামত নিয়েছিল? প্রধান নির্বাচক সৌমিত্র মজুমদার বললেন, ‘আমরা এসবের মধ্যে ঢুকি না। ওটা সম্পূর্ণ সিএবি-র ব্যাপার।’ তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া গেল, সিএবি-র গঠনতন্ত্রে জ্বলজ্বল করছে যে, কোচ নিয়োগ করতে ভূমিকা, মতামত থাকবে নির্বাচক কমিটির। জানা গেল, এসব জানেনই না নির্বাচকেরা।
চার, নির্বাচকদের জিজ্ঞেস করা হল, ত্রৈমাসিক রিপোর্ট কী জমা দেন সিএবি-তে? নির্বাচকেরা বললেন, ‘আমরা নিজেরা সেটা তৈরি করি। নিজেদের মধ্যে আলোচনা হয়।’ কিন্তু লোঢা কমিটির সুপারিশে সংশোধিত গঠনতন্ত্রে যে সিএবি-কে কোয়ার্টারলি রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা! সদুত্তর নেই।
গোটা ঘটনায় সৌরাশিস নতুন করে কী প্রতিক্রিয়া দেন, দেখার অপেক্ষায় গোটা ময়দান।
