চিনের উহান থেকে ছড়ায়নি কোভিড? ভাইরাস কি ল্যাবে তৈরি করা হয়েছিল? হাতে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

অতিমারির প্রকোপ কেটে গিয়েছে। কিন্তু বদনাম ঘোচেনি চিনের। চিনের উহান থেকেই নোভেল করোনাভাইরাস সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল বলে আজও প্রচলিত। কিন্তু সম্প্রতি হাতে আসা তথ্যে অন্য় ইঙ্গিত মিলল।

যে সে ব্যক্তি নন, আমেরিকার হোয়াইট হাউসের প্রাক্তন চিফ মেডিক্যাল অ্যাডভাইসার অ্যান্টনি ফউচির ডায়েরি এন্ট্রি অনুযায়ী, উহানের বাজার থেকে ছড়িয়ে পড়েনি কোভিড-১৯।

আমেরিকার হোয়াইট হাউসের করোনাভাইরাস টাস্ক ফোর্সের অন্যতম সদস্য ছিলেন ফউচি। আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিসেস-এরও ডিরেক্টর ছিলেন। পদে আসীন থাকাকালীন বরাবরই অতিমারির জন্য চিনকে দায়ী করে এসেছেন ফউচি। প্রকাশ্য বিবৃতিতে দাবি করেন, যে Sars-CoV2 ভাইরাসের দরুণ অতিমারির সৃষ্টি হয়, তা চিনের উহান থেকেই ছড়িয়েছিল।

পশু-পাখির শরীর থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে বলে সেই সময় দাবি করেছিলেন ফউচি। কিন্তু ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি ডায়েরিতে তিনি লেখেন, ‘আমরা এখন জানি যে ওই বাজার’ অতিমারির উৎপত্তিস্থল নয়। বরং ইহানের ওই বাজার থেকে সংক্রমণের বিস্তার ত্বরান্বিত হয় বলে দাবি করেন বলে ডায়েরিতে উল্লেখ করেন ফউচি।

আমেরিকার কংগ্রেসের তরফে যে তদন্ত শুরু হয়, তাতে ফউচির ওই ডায়েরি নথি হিসেবে জায়গা পেয়েছে। ডায়েরির লেখা অনুযায়ী, অতিমারি এবং জিনোমিক ডেটা অনুযায়ী, ডিসেম্বরের গোড়ার দিকেই সংক্রমণ মাথাচাড়া দেয়, যার সঙ্গে ওই বাজারের সংযোগ থাকতে পারে।

ডায়েরিতে ফউচি লেখেন, ‘নতুন সংক্রমণ মাথাচাড়া দিয়েছে বলে চিন যখন জানায়, তার কয়েক সপ্তাহ আগেই সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করেছিল। একাধিক প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে গিয়েছিল সংক্রমণ। মনে রাখতে হবে, চিন শুরুতে বলছিল যে একজন মানুষের থেকে অন্য মানুষের শরীরে ভাইরাস ছড়ায় না। প্রাথমিক ভাবে যে ২৭টি অরিজিনাল কেস সামনে আসে, ওই বাজারের সঙ্গে সংযোগ ছিল তাঁদের। এখন আমরা জানি ওই বাজারটি সংক্রমণের উৎপত্তিস্থল ছিল না, বরং সেটি সংক্রমণের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছিল’।

ডায়েরিতে ফউচি যে কথা লিখেছেন, তার সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য বিবৃতি মেলে না। ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি দাবি করেছিলেন, উহানের ‘Wet Market’-এ মানুষ এবং জীবিত পশু-পাখির সংসর্গ থেকেই কোভিড-১৯ অতিমারির সূচনা ঘটে। ২০২১ সালেও নিজের দাবিতে অনড় ছিলেন তিনি। ওই বাজার থেকেই মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে বলে দাবি করেন।

কিন্তু তাঁর ডায়েরি উল্টো কথা বলছে। তবে এই প্রথম নয়, বছর পাঁচেক ধরেই অতিমারি নিয়ে তাঁর অবস্থান ঘিরে প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ উঠেছে যে, অতিমারি নিয়ে তিনি মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন, ভুল তথ্য় পেশ করে প্রভাবিত করেছেন মানুষকে, সরকারি নিয়মনীতিতেও প্রভাব খাটিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি আড়াল করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শুধু তাই নয়, এর আগে কিছু ইমেল ফাঁস হয়ে যায়, যেখানে ভাইরাসের চরিত্র নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ফউচি। এমনকি আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা FBI এবং ব্রিটেনেের গুপ্তচর সংস্থা MI5-কেও বিষয়টি জানাতে উদ্যত হন। জীববিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয় ফউচির। ক্রিশ্চিয়ানের আশঙ্কা ছিল, কৃত্রিম উপায়ে ভাইরাসটি তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। ভাইরাসটির জিনের গঠন বিবর্তনের ধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বসে মনে হয়েছিল ক্রিশ্চিয়ানের।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চিনের উহানে প্রথম কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়ে। একাধিক রিপোর্ট অনুযায়ী, একজনের থেকে অন্যের শরীরে যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে, ২৭ ডিসেম্বর নাগাদই তা বুঝতে পারে চিন। ভাইরাসের জিনোমও শনাক্ত করেছিল তারা। তবে সেই তথ্য অন্য দেশগুলিকে জানায়ন। ভাইরাসটি যে সংক্রামক তাও তারা চেপে গিয়েছিল বলে অভিযোগ। অতিমারির দরুণ গোটা পৃথিবীতে ৭০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান।

তবে নয় নয় করে পাঁচ বছর কেটে গেলেও, এখনও পর্যন্ত ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে ধোঁয়াশা অব্যাহত। এমনকি কোন প্রাণীর শরীর থেকে, কোন জায়গা থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে, তাও নির্দিষ্ট ভাবে জানা যায়নি আজ পর্যন্ত।

পশুপাখির শরীর থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার তত্ত্ব যতটা না জোরাল, গবেষণাগার থেকে দুর্ঘটনাবশত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার তত্ত্ব তুলনায় অনেক বেশি জোরাল। Wellcome Trust-এর ডিরেক্টর জেরেমি ফরার থেকে ভাইরোলজিস্ট মাইকেেল ফরজান এবং এডওয়ার্ড হোমসের মতো বিশেষজ্ঞরা ল্যাবরেটরি থেকে দুর্ঘটনাবশত ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার তত্ত্বকেই এগিয়ে রাখছেন এক্ষেত্রে। তবে প্রকাশ্যে কেউই বিষয়টি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে নারাজ।
Published at : 29 Jul 2026 07:44 PM (IST)
