সন্দীপ সরকার, কলকাতা: রাজ্যে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কয়লা চুরি, বালি চুরির মতো ঘটনা বারবার শিরোনামে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক তরজা চলেছে জোরকদমে। কিন্তু মাটি চুরি, আর সেই ‘চোরাই মাটি’ নিয়ে ক্রিকেট মাঠে বিভ্রাট! বাংলার ময়দানে এ জিনিস আগে শোনা যায়নি।
সরকারি কড়াকড়িতে ‘চোরাই মাটি’ আটকে যাওয়ায় বিপাকে বাংলার ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা সিএবি। ময়দানের সমস্ত মাঠে পিচ কীভাবে তৈরি হবে, আদৌ সময়ে তৈরি করা যাবে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। ড্যামেজ কন্ট্রোলে না নামলে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সিএবি প্রশাসন হয়তো উপলব্ধিই করত না যে, মাটি নিয়েও এরকম ঝক্কি পোহাতে হতে পারে।
ঠিক কী হয়েছে?
ফি বছর বর্ষার আগেই ময়দানের সমস্ত মাঠের পিচ তৈরির জন্য ক্লাবগুলিকে মাটি সরবরাহ করে সিএবি। আগে সিএবি থেকে শুধু মাঠ তৈরির জন্য ক্লাবগুলিকে আর্থিক অনুদান দেওয়া হতো। কিন্তু গত বেশ কয়েক বছর ধরেই পিচের মাটিও সরবরাহ করে সিএবি। যাতে ময়দানের সব মাঠে পিচ সমমানের হয়। যাতে পিচের চরিত্রে বৈষম্য না থাকে। পিচ স্পোর্টিং হলে খেলার মান ভাল হবে। সার্বিকভাবে ক্রিকেটের উন্নয়নে যা প্রাথমিক শর্ত বলে এককথায় মেনে নেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। সেই উদ্দেশেই মাটির জোগান দেওয়ার এই নিয়ম চালু করে সিএবি।
তা হলে সমস্যাটা কোথায়? এবার বর্ষা মাঝপর্বে। অথচ এখনও পিচ তৈরির জন্য মাটি পায়নি সিএবি। উত্তর ২৪ পরগনার দেগঙ্গার শাসন, বসিরহাট এলাকা থেকে ময়দানের সব মাঠের পিচ তৈরির মাটি আনায় সিএবি। আর ইডেন গার্ডেন্সের মাটি আসে তারকেশ্বর থেকে। উত্তর ২৪ পরগনার যে ব্যক্তি টাকার বিনিময়ে মাটি সরবরাহ করে থাকেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলে সিএবি জানতে পারে যে, পুলিশ আটকে দেওয়ায় নাকি তিনি গাড়ি করে মাটি কলকাতায় পাঠাতে পারছেন না। তিনি নাকি সিএবি কর্তাদের এও জানান যে, উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসকের সঙ্গে কথা বলে অনুমতি নিতে হবে। অথচ সিএবি ইতিমধ্যেই অগ্রিম টাকা দিয়েছে ওই ব্যক্তিকে।
এরপরই কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরনোর অবস্থা হয়। জানা গেল, সিএবি সচিব বাবলু কোলে গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্য়ান অমিতাভ আঢ্য ও আম্পায়ার্স কমিটির প্রধান প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দেন, উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসকের দফতরে গিয়ে কথা বলতে।
বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা গেল, সিএবি প্রতিনিধি হিসাবে অমিতাভ ও প্রসেনজিৎ উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসকের দফতরে যান। সেখানে অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি সংস্কার – ADM LR)-কে সমস্যার কথা জানান তাঁরা। তিনি জানতে চান, কার থেকে মাটি নেয় সিএবি? সেই সময় ডেকে পাঠানো হয় সেই ব্যক্তিকে, যিনি সিএবিকে পিচের মাটি সরবরাহ করেন। অতিরিক্ত জেলাশাসকের (ভূমি সংস্কার) প্রশ্নে যিনি জানান, মাটি কেটে সরবরাহ করার লাইসেন্স তাঁর নেই। প্রশ্নের মুখে তিনি নাকি এ-ও জানান যে, অন্যান্য বছর পুলিশকে ‘ঘুষ’ দিয়ে তিনি মাটি সরবরাহ করতেন। কখনও সমস্যা হয়নি। যা শুনে অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি সংস্কার) হতবাক হয়ে যান। সিএবি প্রতিনিধিরাও অস্বস্তিতে পড়েন।
জানা গেল, এরপর ভূমি রাজস্ব দফতরের এক কর্তাকে বিষয়টি দেখতে বলেন অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি সংস্কার)। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। ভূমি রাজস্ব দফতরের কর্তা মাটি সরবরাহকারী ওই ব্যক্তিকে বলেন, যে জমি থেকে মাটি কেটে সিএবিকে দেবেন, তার দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বর দিতে। সেই ব্যক্তি তা জমাও করেন। কিন্তু দেখা যায়, সেই জমি ওই সরবরাহকারীর সম্পত্তি নয়, বরং অন্য এক মালিকের। ফের তৈরি হয় জট।
শোনা গেল, ক্রিকেটের স্বার্থে বিশেষ ছাড়পত্র দিয়ে এবারের মতো কিছুটা মাটি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি সংস্কার)। পাশাপাশি বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। ১২ জন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডিলারের নাম ও ফোন নম্বরের তালিকা দিয়ে সিএবি প্রতিনিধিদের তিনি বলেছেন, কেন সরকারি নথিভুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে মাটি নেয় না সিএবি? কেন ঘুরপথে, অবৈধ মাটি নেওয়া হয়? কেন দরপত্র চেয়ে ডিলারদের কাছ থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে চাহিদামতো পছন্দের মাটি নেওয়ার পরিচ্ছন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে না সিএবি? স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রশ্নের সদুত্তর ছিল না সিএবি প্রতিনিধিদের কাছে।
এরপরই সিএবি-র অন্দরে শুরু হয়েছে তোলপাড়। বলাবলি হচ্ছে, কেন মাটি কাটার লাইসেন্স নেই, এরকম কারও থেকে অবৈধভাবে তোলা মাটি প্রত্যেক বছর নেয় সিএবি? কেন পাকা রশিদ ছাড়াই নগদে মাটির দাম মেটানো হয় সিএবি থেকে? এ-ও প্রকাশ্যে আসে যে, প্রত্যেক লরি পিছু প্রায় ১২-১৪ হাজার টাকা করে ব্যয় হয় সিএবি-র। সব মিলিয়ে সিএবির অধীনস্থ কমবেশি ৪০টি মাঠের জন্য প্রায় একশো গাড়ি মাটি লাগে প্রত্যেক বছর। সিএবি-র একাংশ থেকে বলা হচ্ছে, গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান থাকাকালীন সিএবি-র অধুনা অপসারিত যুগ্মসচিব মদন ঘোষ ও কিউরেটর সুজন মুখোপাধ্যায় গোটা বিষয়টির তত্ত্বাবধান করতেন। কারও কারও প্রশ্ন, অবৈধ মাটি কেনার কথা তাঁরা কি কেউই জানতেন না? নাকি অন্য কোনও স্বার্থ কাজ করেছে?
সিএবি-র বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর থেকে কেউ কেউ আবার বললেন, দুর্নীতির দায়ে অপসারিত প্রাক্তন যুগ্মসচিব দেবব্রত দাস গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন যখন, সেই থেকেই এরকম অনিয়ম চলে আসছে। অভিযোগ, তিনিও নাকি মাটি কেনা নিয়ে অনিয়ম করতেন। নাম প্রকাশ করা যাবে না, সেই শর্তে একজন বললেন, ‘আগেও দেবব্রত দাসের আমলে মাটি কেনা নিয়ে নানারকম অনিময়ের অভিযোগ আসত। পরে মদন ঘোষ গ্রাউন্ডস কমিটির প্রধান থাকার সময়ও একইরকম অভিযোগ উঠেছে।’
এ ব্যাপারে দেবব্রত দাসের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল এবিপি লাইভ বাংলা। প্রাক্তন যুগ্মসচিব অভিযোগ শুনে বললেন, ‘আমার আমলে তো লরি পিছু ৪-৫ হাজার টাকা করে খরচ পড়ত। এখন তো তার তিনগুণ খরচ হয়। অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেদের দিকটা দেখুক সিএবির বর্তমান শাসকরা।’
যদিও এবারের মতো বিভ্রাট আগে কখনও হয়নি। শোনা গেল, সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কেও পুরো ঘটনাটি জানানো হয়েছে। শাসক গোষ্ঠীর কারও কারও মতে, মাটি নিয়ে দুর্নীতি হতে পারে, সেটা নাকি তাঁদের ধারণার বাইরে ছিল। গোটা ঘটনায় বিব্রত সিএবি পরের মরশুম থেকে পিচের মাটি কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার জন্য় টেন্ডার করে বৈধ ডিলারদের কাছ থেকে দরপত্র চাওয়ার পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: আইপিএলের সেরা মাঠের পুরস্কার অর্থের ভাগ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ সিএবিতে! মঙ্গলবার বৈঠক ইডেনে
