নয়াদিল্লি: ঘরে বসেই বিশ্বভ্রমণ। নিজেকে খুঁজে পাওয়া। বইপোকারা এই অনুভূতি জানেন। কিন্তু স্ক্রোলিংয়ের যুগে পাতা ওল্টানোর ইচ্ছা কমছে ক্রমশ। নেড়েচেড়ে না দেখার ফলে ধুলো জমে যাচ্ছে বইয়ের তাকে। সেই পরিস্থিতিতেই উদ্বেগজনক খবর সামনে এল। লক্ষ লক্ষ বই ধ্বংসের অভিযোগ তাবড় AI সংস্থার বিরুদ্ধে। (Books Are Being Destroyed)
যুদ্ধ, বন্যা, আগুন, নিষেধাজ্ঞা এবং সময়ের খাঁড়া থেকে মাথা বাঁচিয়ে এখনও বই আগলে রাখার চেষ্টা করেন অনেকে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের ভাণ্ডার রেখে যেতে আগ্রহী তাঁরা। কিন্তু সেই বই-ই ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলছে AI সংস্থাগুলি। ইতিহাস,সংস্কৃতির প্রমাণপত্র নয়, তাদের হাতে বই হয়ে উঠছে নিছক কাঁচামাল, যা ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধমত্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কাজ শেষ হয়ে গেলে যত্ন সহকারে ব্যবহারের পর ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে, নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে বই। (AI Training)
আরও পড়ুন: ক্রকস ছাড়া চলে না? পায়ের ক্ষতি করছেন, নিজেরও, শিশুরও, সতর্ক করলেন চিকিৎসকরা
ইউরোপ-সহ একাধিক দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ বই নষ্টের অভিযোগ সামনে আসছে। নেদারল্যান্ডসের সেন্টার অফ হারলেমের পিতর ডি ভ্রিজ মূলত মানচিক্র, অলঙ্করণ এবং ছাপা পুরনো বিক্রি করেন। তাঁর কাছে ১৬ এবং ১৭ শতকের বইও রয়েছে। দুর্লভ বইয়ের ব্যবসায়ী হিসেবে নামডাক রয়েছে তাঁর। তিনি জানিয়েছেন, জুনের মাঝামাঝি সময়ে ইমেলে বইয়ের বরাত দেওয়া হয় তাঁকে। একটি তালিকা দেওয়া হয়েছিল, যাতে প্রায় ৩০০০ বইয়ের নাম ছিল। ন্যাটালি নামের এক তরুণী ওই বইগুলি অর্ডার করেন। জানান, তিনি 2077AI সংস্থায় কর্মরত। ইংরেজি-সহ বিভিন্ন ভাষার বই কিনতে আগ্রহী বলে জানান ন্যাটালি। প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি পিতরের। এদিক ওদিক খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, তিনি একা নন, অনেককেই কাছেই হাজার হাজার বইয়ের বরাত দেওয়া হয়েছে। সিলিকন ভ্য়ালি থেকে বিভিন্ন জনের মাধ্যমে অর্ডার আসছে বলে জানতে পারেন তিনি।
দুষ্প্রাপ্য এবং পুরনো বইপত্র বিক্রি করেন যাঁরা, একে একে মুখ খুলতে শুরু করেছেন অনেকেই। তাঁরা জানিয়েছেন, হঠাৎ করেই প্রচুর বইয়ের বরাত পেতে শুরু করেন তাঁরা। এক একটি সংস্থা একসঙ্গে কয়েক হাজার পুরনো বইয়ের অর্ডার দিতে শুরু করে। ওই সব বই নিয়ে কী হচ্ছে, তা অনেক পরে জানতে পারেন তাঁরা। সময়ের সঙ্গে অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন বিষয়টি নিয়ে। বই নষ্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন: সমাবর্তন বাতিল করল TISS, প্রধান অতিথি হয়ে আসার কথা ছিল CJI সূর্যকান্তের, বিক্ষোভের আশঙ্কা থেকেই কি?
প্রযুক্তি সংক্রান্ত খবরাখবর তুলে ধরে 404 Media. তারাই বিষয়টি সামনে এনেছে। জানিয়েছে, ISBNdb নামের একটি সংস্থার তরফে একবারে ১০ লক্ষ বইয়ের অর্ডার দেওয়া হয়। এমন বইও কিনতে চায় তারা, যেগুলির দ্বিতীয় প্রতিলিপি নেই। ব্রিটেনের ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ জানিয়েছে, বই কিনে সেগুলি নষ্ট করার নেপথ্যে রয়েছে সিলিকন ভ্যালি। AI যন্ত্রের শক্তিবৃদ্ধি করতে চাইছে তারা। লক্ষ লক্ষ বই কিনে এনে ফেলা হচ্ছে গবেষণাগারে। প্রথমেই বাঁধন ছিঁড়ে পাতা আলাদা করে ফালা বচ্ছে। প্রত্যেকটি পাতা স্ক্যান করা হচ্ছে সেই অতি দ্রুত গতিতে চোখের নিমেষে সেগুলিকে লেখায় কনভার্ট করে নিচ্ছে অত্যাধুনিক সফ্টওয়্যার। ঝড়ের গতিতে সেই ডেটা গেলানো হচ্ছে যন্ত্রকে। তবে বইগুলির আর অস্তিত্ব থাকছে না। কুচি কুচি করে মণ্ডে পরিণত করা হয় সেগুলিকে। নতুন AI মডেলগুলিকে প্রশিক্ষিত করতেই গোপনে এই প্রকল্প শুরু হয়েছে। যে হারে বই ধ্বংস করা হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যন্ত্র বই পড়ে না, আবেগ অনুভব করে না। তারা শুধু ডেটা সংগ্রহ করে। প্রত্যেক গল্প, উপন্যাস, ঐতিহাসিক তথ্য, বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা, দর্শন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে AI-কে আরও শক্তিশালী করে তোলাই লক্ষ্য় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির। কারণ AI দিয়ে তৈরি কনটেন্ট এই মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়েছে নেটদুনিয়ায়। ইন্টারনেটের সার্বিক ব্যবহারে তা হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে সকলেক কাছে। কিন্তু এতে AI মডেলগুলির গুণমান হ্রাস পাচ্ছে। তাই AI-এর প্রভাবের বাইরে গিয়ে মানুষের দ্বারা লেখা দুর্লভ বই, পাণ্ডুলিপি, গবেষণাপত্র থেকে জ্ঞান আহরণ করছে AI. AI-এর হাতে অর্থ হয়ে ওঠে প্যাটার্ন, গল্প ডেটাসেটে পরিণত হয়, সাহিত্য হয়ে ওঠে কোড। শুধু মানুষের জ্ঞানের জন্য নয়, যন্ত্রকে প্রশিক্ষণ দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে বই।
কিন্তু লক্ষ লক্ষ দুর্লভ বই কেন ধ্বংস করা হচ্ছে, সেই নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ নিয়ে ধনকুবের ইলন মাস্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, তাঁরা কোনও বই ধ্বংস করেননি। বরং SpaceX AI টিমকে নির্দেশ দেওয়া রয়েছে যে, বই না কেটে স্বাভাবিক উপায়ে স্ক্যান করতে। তার পর যত্ন সহকারে তা সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু অনলাইন এবং অফলাইন যেভাবে বেনামে লক্ষ লক্ষ বই কেনা হচ্ছে, তাতে তাঁর কথায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না অনেকেই। বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ নতুন কোনও বিষয় নয়। কিন্তু সেগুলি ব্যবহারের পর শত শত বছরের নথি, ইতিহাস ধ্বংস করার যৌক্তিকতা কী, প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
