June 16, 2026
db2e23577501758ef288a9fc92bc50141781625542474223_original.png
Spread the love



একুশ শতকের গোড়ায় যখন মহাকাশ গবেষণায় মানবজাতি নিজেদের গৌরবের গল্প লিখছিল, তখন পৃথিবীর এক প্রান্তে একজন তরুণী নারী মানুষ নয়, নামানুষের মন বুঝতে নেমেছিলেন। তার নাম-ডক্টর জেন গুডঅল। ১৯৬০ সালে, ব্রিটেনের এক কিশোরী বই হাতে বসে ছিল আফ্রিকার বন্যজঙ্গলের স্বপ্নে। তখন সে জানত না, একদিন তার নামই হবে প্রাণীবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিপ্লবের প্রতীক। সে এমন এক গবেষণা শুরু করবেন, যা মানুষের “মানুষ” হওয়ার ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।

কঙ্গো নদীর তীরে, তানজানিয়ার গোম্বে ন্যাশনাল পার্ক। এক ভোরে দূরবীন হাতে জেন পাহাড়ের ঢালে বসে আছেন। নিচে ঘন ঝোপে একদল শিম্পাঞ্জি ফল খুঁজছে। একটিকে তিনি আলাদা করে লক্ষ্য করলেন-সে সাবধানে একটি ডাল ভেঙে নিয়ে পিঁপড়ের বাসায় ঢুকিয়ে বের করছে, তারপর পিঁপড়ে চেটে খাচ্ছে। জেন বিস্মিত হলেন। “ওরা সরঞ্জাম ব্যবহার করছে!” এই দৃশ্য মানুষের জ্ঞানবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে, কারণ, এর আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন মানুষই একমাত্র যন্ত্র ব্যবহারকারী প্রাণী। কিন্তু জেন প্রমাণ করলেন, শিম্পাঞ্জিরাও বুদ্ধিমত্তার শিখরে পৌঁছাতে পারে।

গুডঅলের এই আবিষ্কার বিজ্ঞানকে কাঁপিয়ে দেয়। নোবেলজয়ী জীববিজ্ঞানী লুইস লিকি তাকে বলেছিলেন, “আমাদের হয় মানুষের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবতে হবে, নয়তো শিম্পাঞ্জিদের মানুষ বলতে হবে।” এরপর থেকে প্রাণী বিজ্ঞানের পাঠে “মানুষ বনাম প্রাণী”র বিভাজনরেখা অনেকটা মুছে যায়। জেন দেখিয়েছিলেন শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে ভালোবাসা, রাগ, প্রতিশোধ, সহানুভূতি ও শিক্ষা আছে। প্রথমদিকে গোম্বের শিম্পাঞ্জিরা জেনকে ভয় পেত। তারা দূরে পালিয়ে যেত। মাসের পর মাস তিনি নিঃশব্দে বসে থাকতেন, শুধু তাদের পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি কখনও হঠাৎ নড়তেন না, কখনও দৃষ্টি সরাতেন না। ধীরে ধীরে একদিন, এক শিম্পাঞ্জি তার দিকে এগিয়ে এল। হাতে ছিল একটি কলা। সে তা জেনের দিকে বাড়িয়ে দিল। এটাই ছিল তাদের মধ্যে প্রথম বন্ধুত্বের মুহূর্ত। সেই শিম্পাঞ্জিটির নাম তিনি দিলেন ডেভিড গ্রেবিয়ার্ড। পরে এই ডেভিডই ছিল তার গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। জেন গুডঅলের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে শিম্পাঞ্জিদের জটিল সামাজিক জীবন। তাদের সমাজে আছে নেতৃত্ব, গোষ্ঠী রাজনীতি, বন্ধুত্ব, এমনকি বিশ্বাসঘাতকতাও। একটি গল্প বিজ্ঞানীদের মন কেড়েছিল-এক মা শিম্পাঞ্জি “ফ্লো” ও তার ছেলে “ফ্লিন্ট”। মা মারা গেলে ফ্লিন্ট খাওয়া বন্ধ করে দেয় ও একা বসে থাকে, শেষমেশ ধীরে ধীরে সে মারা যায়। জেন লিখেছিলেন, “ফ্লিন্টের মৃত্যু আমাকে বুঝিয়েছিল-দুঃখ কেবল মানুষের নয়, প্রাণীদেরও আছে।” এই পর্যবেক্ষণ থেকেই প্রাণীর “আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা” নিয়ে আধুনিক মনোবিজ্ঞানে নতুন মাত্রা পায়। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে শিম্পাঞ্জিদের শরীরে অক্সিটোসিন ও ডোপামিন হরমোনের উপস্থিতি শনাক্ত করেন, যা মানুষের ভালোবাসা ও আনন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থাৎ যখন শিম্পাঞ্জি মায়ের কোলে তার বাচ্চা ঘুমায়, বা বন্ধুকে আলিঙ্গন করে তার মস্তিষ্কেও মানুষের মতোই ভালোবাসার হরমোন ক্ষরিত হয়। জেনের এই গবেষণাই প্রথম দেখায় যে ভালোবাসা কেবল মানুষদের নয়, প্রাণীদেরও হয়।

তবে শিম্পাঞ্জির সমাজে কেবল স্নেহ নয়, আছে ক্ষমতার দ্বন্দ্বও। একসময় জেন লক্ষ্য করলেন, দুটি শিম্পাঞ্জি  গোষ্ঠী কাসেকালা ও কাহামা একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু করেছে। পুরুষ শিম্পাঞ্জিরা দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করে প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে হত্যা করছে। এ ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা নাম দেন ‘শিম্পাঞ্জি যুদ্ধ’। মানুষের ইতিহাসে যুদ্ধ যেমন সভ্যতার অন্ধকার দিক, তেমনিই শিম্পাঞ্জিরাও প্রমাণ করে সহানুভূতির পাশাপাশি আগ্রাসনও কিন্তু বিবর্তনের অংশ। গুডঅলের গবেষণা কেবল বিজ্ঞানের নয়, মানবিকতার দিক থেকেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

ডক্টর জেন গুডঅল ও শিম্পাঞ্জি: বিজ্ঞান ও ভালোবাসা
তিনি বলেছিলেন, “আমরা যদি প্রাণীদের আবেগ বুঝতে পারি, তবে হয়তো মানুষকে আরও মানবিকভাবে ভালোবাসতে শিখব।” পরবর্তী জীবনে তিনি “Jane Goodall Institute” গঠন করেন এটি একটি বৈজ্ঞানিক ও সংরক্ষণমূলক সংগঠন যা আজও আফ্রিকার বনভূমি ও শিম্পাঞ্জি প্রজাতি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।

জেনের গবেষণার ফলে আজ আমরা জানি, মানুষের ও শিম্পাঞ্জির ডিএনএ এর মিল ৯৮.৭ শতাংশ। এই সামান্য জেনেটিক পার্থক্যই আমাদের দিয়েছে ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি কিন্তু আবেগ, বন্ধন, মাতৃত্ব ও ভালোবাসা আমাদের মধ্যে অভিন্ন। যখন কোনো শিম্পাঞ্জি বাচ্চা মাকে হারিয়ে কাঁদে বা দুই বন্ধু আলিঙ্গনে মিলে যায় তখন আমরা কিন্তু নিজেদের প্রতিচ্ছবিই দেখি।

একদিন জেন তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন-“আমি ওদের দিকে তাকিয়ে থাকি, দেখি তারা কেমন করে ফল ভাগ করে খায়, একে অপরের লোম থেকে পোকা বেছে দেয়, আর মনে হয়, ওরা আমাকে মানুষের প্রাচীন রূপ দেখাচ্ছে।” এই ‘প্রাচীন রূপ’ই আমাদের বিবর্তনের ইতিহাস। যে মুহূর্তে মানুষ প্রথমবার অন্যের জন্য কিছু করেছিল, প্রথমবার কারও মৃত্যুর জন্য কেঁদেছিল সেই মুহূর্ত থেকেই ভালোবাসার জন্ম হয়েছিল। ডক্টর জেন গুডঅল প্রমাণ করেছেন-বিজ্ঞান কেবল পরীক্ষাগারে জন্মায় না, এটি জন্মায় সহানুভূতির চোখে ও ভালোবাসার বন্ধনে।

লেখক- পূর্ব বর্ধমানের আঝাপুর হাই স্কুলের সহ শিক্ষক। প্রতিবেদনটি এবিপি লাইভ কর্তৃক বিষয়-সম্পাদিত নয়।  



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Enable Notifications OK No thanks