সন্দীপ সরকার, কলকাতা: পোশাকি নাম সেন্টার অফ এক্সেলেন্স বা COE। তবে ভারতীয় ক্রিকেটের হাঁড়ির খবর রাখেন যাঁরা, তাঁরা বলেন বেঙ্গালুরুর সিওই আসলে একইসঙ্গে গবেষণাগার ও কারখানা। যেখানে ভারতীয় ক্রিকেটের পরিচিত অস্ত্রে শান দেওয়া চলে। পাশাপাশি বাইশ গজে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপনের প্রকল্পও চালানো হয় উঠতি প্রতিভাদের নিয়ে। পুরোটাই রুটিন মেনে। বিজ্ঞানভিত্তিক। আধুনিক চিন্তাভাবনায় সম্পৃক্ত।
যে সিওই-তে এখন চলছে নতুন অস্ত্র তৈরির প্রস্তুতি। যে অস্ত্র লাল বলের ক্রিকেটে জাতীয় দলের ব্রহ্মাস্ত্রে পরিণত হবে। টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের সাম্প্রতিক বিবর্ণ ছবি বদলে দিয়ে রঙিন, ঝলমলে ধ্বজা ওড়াবে। আর সেই অস্ত্র তৈরির নকশায় ভীষণভাবেই জড়িয়ে গেলেন এক বঙ্গসন্তান। বাংলার প্রাক্তন অফস্পিনার সৌরাশিস লাহিড়ী।
টেস্ট ক্রিকেটে ভারতীয় দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স লজ্জাজনক। দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের কাছে হোয়াইটওয়াশ। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ঘরের মাঠে কলঙ্কের সিরিজ হার। যে স্পিন একসময় ভারতীয় দলের বোলিং বিভাগের কোহিনূর ছিল, সেই স্পিন-অস্ত্রই এখন ভোঁতা। বরং ছড়ি ঘুরিয়ে যাচ্ছেন প্রতিপক্ষ স্পিনাররা। আর অশ্বিন অবসর নেওয়ার পর থেকে টেস্টে স্পিন বোলিং আক্রমণ নিয়ে আরও সমস্যায় ভারতীয় দল। তার ওপর সামনের বছর জানুয়ারি মাসে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। এখন থেকেই বলাবলি হচ্ছে যে, ২০২৫-২০২৭ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ বৃত্তে ভারতের সামনে WTC ফাইনাল খেলার সুযোগ একমাত্র আসতে পারে যদি দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে নাস্তানাবুদ করা যায়। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায় অস্ট্রেলিয়া শীর্ষে। ভারত পাঁচ নম্বরে। অস্ট্রেলিয়া সিরিজ তাই ভীষণ গুরুত্ব পাচ্ছে টিম ইন্ডিয়ার কাছে। আর সেই সিরিজের নকশা সাজাতে এখন থেকেই বসে পড়েছেন ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীর।
দেশের মাটিতে টেস্টে শেষ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ বলতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে খেলেছে ভারত। ২-০ ব্যবধানে সিরিজ হেরেছিল। সেই সিরিজে স্পিনার হিসাবে খেলেছিলেন রবীন্দ্র জাডেজা, কুলদীপ যাদব, ওয়াশিংটন সুন্দর ও অক্ষর পটেল। ওয়াশিংটন ও অক্ষর বল হাতে কিছুই করতে পারেননি। জাডেজা ও কুলদীপও ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগেছেন। তার ওপর অস্ট্রেলিয়া সিরিজের সময় জাড্ডুর বয়স হবে ৩৮ বছর। ভারতীয় দল বিকল্প অস্ত্র তৈরি রাখতে চাইছে। লাল বলের ক্রিকেটে চাইছে দু-একজন ভাল মাপের রিস্টস্পিনার। যাঁরা কব্জির ভেল্কিতে বাজিমাত করতে পারবেন।
আর সেই কাজই শুরু হয়ে গেল COE-তে। লাল বলের ক্রিকেটে প্রতিশ্রুতিমানদের নিয়ে যেখানে হয়ে গেল ইমার্জিং টুর্নামেন্ট। ৪ দলের টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হল ইন্ডিয়া টিম এ। যে দলের অন্যতম কোচ ছিলেন সৌরাশিস। নিজের রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা যাঁকে যোগ্য মনে করেনি। বাংলার অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচের পদ থেকে ছেঁটে ফেলেছিল। যা নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বড় দায়িত্ব দিয়েছিল সৌরাশিসকে। উদয় সাহারানের নেতৃত্বে ইমার্জিং টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হল সৌরাশিসের প্রশিক্ষণাধীন দলই। সেই দলের হয়ে খেললেন উত্তর প্রদেশের ২১ বছর বয়সী লেগস্পিনার বিপ্রজ নিগম। রঞ্জি ট্রফিতেও অল্প সময়েই নজর কেড়েছিলেন। আইপিএলে খেলেন দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে। বিপ্রজের ব্যাটের হাতও ভাল। ভারতীয় টেস্ট দলের ব়্যাডারে রয়েছেন তরুণ লেগস্পিনার। গম্ভীরের চাহিদা পূরণ করার দক্ষতাও রয়েছে তাঁর।
এছাড়াও গুজরাতের হয়ে ৪৭ ম্য়াচে ২২৪ উইকেট নেওয়া বাঁহাতি স্পিনার সিদ্ধার্থ দেশাই, বঢোদরার হয়ে ২৪ ম্যাচে ৯৭ উইকেট নেওয়া অফস্পিনার মহেশ পিঠিয়া, লেগস্পিনার জিশান আনসারিরা রয়েছেন ভারতের টেস্ট দলে স্পিন কোটায় ঢোকার দাবিদার হিসাবে। সব মিলিয়ে ভারতীয় টেস্ট দলের হতশ্রী চেহারা দ্রুত বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এই তরুণ, প্রতিশ্রুতিমানরা, নিশ্চিত গুরু সৌরাশিসও।
টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার দিন বেঙ্গালুরু থেকে এবিপি লাইভ বাংলাকে সৌরাশিস বললেন, ‘লাল বলের ক্রিকেটে ভারত হয়তো কয়েকটা সিরিজে প্রত্যাশিত খেলতে পারেনি। তবে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এত বিজ্ঞানসম্মত, অত্যাধুনিক চিন্তাভাবনা মেনে চলে, এত পেশাদার একটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় সিওই-তে, যে টেস্ট দলের ছবিটা দ্রুত বদলাতে বাধ্য। ইমার্জিং টুর্নামেন্টেও এক ঝাঁক দারুণ প্রতিভাবান ছেলেকে দেখে ভীষণ ভাল লেগেছে। সবচেয়ে বড় কথা, একানকার পরিবেশটাই অন্যরকম। সিওই প্রধান ভি ভি এস লক্ষ্মণ তো ছিলেনই, সেই সঙ্গে সিনিয়র ও জুনিয়র জাতীয় নির্বাচকেরা, এক ঝাঁক অভিজ্ঞ কোচ, সকলে মিলে দারুণ একটা টুর্নামেন্ট হল। লাল বলের ক্রিকেটে ভারতীয় বোর্ড বাড়তি জোর দিচ্ছে। এই ফর্ম্যাটেও জাতীয় দল শীঘ্রই ঘুরে দাঁড়াবে। সেই কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে।’
লাল বলের ক্রিকেটে নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে ভারত। যে স্বপ্নের অন্য়তম ফেরিওয়ালা বাংলার এক কোচও।
