নয়াদিল্লি: মহাকাশে প্রকাণ্ড আয়না বসানোয় অনুমতি দিল আমেরিকার সরকার। পৃথিবীতে অতিরিক্ত সূর্যালোকের চাহিদা পূরণ করতে এবং সৌরশক্তির জোগান বাড়াতেই এমন সিদ্ধান্ত। পরীক্ষামূলক ভাবে প্রথমে একটি প্রকাণ্ড আয়না বসানো হবে। আগামীতে ৫০০০০ আয়না বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেই মতো একটি স্টার্টআপ সংস্থাকে মহাকাশে আয়না বসানোর অনুমতি দিল আমেরিকার সরকার। (Space Mirror to Light Night Sky)
Reflect Orbital নামের সংস্থাকে আয়না বসাতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে মহাকাশে প্রকাণ্ড একটি আয়না পাঠাবে তারা, যা সূর্যাস্তের পরও পৃথিবীতে বাড়তি সূর্যালোক পৌঁছে দেবে। পরীক্ষামূলক ভাবে তারা Eärendil-1 মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করবে, যা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে আয়নাটিকে রেখে আসবে। চলতি বছরের শেষ দিকেই এই কাজ সম্পন্ন হবে বলে জানা গিয়েছে। (Space Mirror)
মহাকাশে বসছে আয়না, ধাপে ধাপে ৫০০০০?
Reflect Orbital স্টার্টআপটি ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত। তাদের প্রস্তাব খতিয়ে দেখে এই পরীক্ষায় অনুমতি দিয়েছে US Federal Communications Commission (FCC). প্রথমে একটি ৬০ ফুটের আয়না বসানো হবে মহাকাশে, যা অতিরিক্ত সূর্যালোক প্রতিফলিত করবে পৃথিবীতে। সৌরশক্তি নির্ভর কৃষিকার্য থেকে উদ্ধারকার্য চালাতে, রাস্তার আলোকিত রাখতে ওই বাড়তি সূর্যালোক কাজে লাগবে বলে জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার Reflect Orbital-কে সেই মর্মে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের শেষেই Earendil-1 মহাকাশযানে চাপিয়ে ৬০ ফুটের আয়না মহাকাশে পাঠাবে তারা। প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষায় সাফল্য মিললে আগামী দিনে আরও ৫০০০০ আয়না বসানো হবে মহাকাশে।
আরও পড়ুন: মাটন খাওয়ানোর কথা ছিল, পাতে চিকেন পড়তেই হুলস্থুল, বিয়েবাড়িতে মারামারি, আহত ১২
প্রথম যখন এই প্রস্তাব ওঠে, সেই সময় থেকেই এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছেন মহাকাশ বিজ্ঞানী, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁদের মতে, ওই আয়না থেকে প্রতিফলিত আলো ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিমানচালকরা বিভ্রান্ত হতে পারেন আকাশে, পৃথিবী থেকে মহাকাশ নিয়ে যে সমস্ত গবেষণা চলে, তাতেও বিঘ্ন ঘটতে পারে, পাশাপাশি, সার্কেডিয়ান রিদম অর্থাৎ মানবশরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ির উপরও প্রভাব পড়তে পারে, যা আলো এবং অন্ধকারের একটি চক্র, যার উপর মানুষ, প্রাণী এবং উদ্ভিদ জগতের জেগে থাকা, ঘুমানোর সময়কাল নির্ভর করে। ফুল ফোটা, পরিযায়ী পশু-পাখিদের স্থানান্তরণের উপরও প্রভাব পড়তে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
মহাকাশে আয়না বসালে বিপদ কেন?
কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ রেজিনার মহাকাশ বিজ্ঞানী সামান্থা এল দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর কথায়, “একটা দেশ চাইলে পৃথিবীর সকলের জন্য দিন-রাতের হিসেব বদলে দিতে পারে, এটা ভেবেই আতঙ্কিত আমি। গবেষণার জন্য রাতের আকাশ প্রয়োজন আমার। আয়না বসিয়ে আলো প্রতিফলিত করলে, সেই গবেষণার কাজ বাধাপ্রাপ্ত হবে।” গত মাসে আমেরিকান অ্যাস্ট্রনমিক্যাল সোসাইটির তরফে একটি চিঠিও দেওয়া হয় FCC-কে। এই প্রকল্প জনস্বার্থ বিরোধী বলে দাবি করে তারা। মহাকাশ গবেষণার কাজে বিঘ্ন ঘটলে করদাতাদের টাকা নষ্ট হবে, বন্যপ্রাণের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলে জানানো হয় চিঠিতে। রুহি দালাল লেখেন, ‘Reflect Orbital-এর কাজকর্মে গোটা পৃথিবীর পরিবেশের উপর প্রভাব পড়তে পারে, মানুষের স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হবে এতে, কৃষিকার্য, বন্যপ্রাণ, সবের উপর প্রভাব পড়বে। মহাকাশ গবেষণার কাজ না হয় বাদই দেওয়া হল’।
এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৬০ ফুচের আয়নাটি Refclect Orbital-এর প্রথম প্রোটোটাইপ। মহাকাশের ৪০০ মাইল উচ্চতায় চতুর্ভুজাকার আয়নাটিকে বসানো হবে। আপাতত পৃথিবীপৃষ্ঠের তিন মাইল একটি বৃত্তাকার অংশকে আলোকিত করবে সেটি। ২০০৮ সাল শেষ হতে হতে ১০০০টি বড় আয়না পাঠানো হবে মহাকাশে। ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৫০০০ আয়না বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সর্ববৃহৎ ১৮০ ফুটের আয়না বসানোর পরিকল্পনাও রয়েছে ওই সংস্থার, যা ১০০টি পূর্ণিমার চাঁদের সমাব আলো প্রতিফলিত করতে পারবে পৃথিবীতে। FCC-র যুক্তি, তারা শুধুমাত্র একটি আয়না বসিয়ে পরীক্ষায় অনুমোদন দিয়েছে, যা মহাকাশে আমেরিকার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। Reflect Orbital-এর পরিকল্পনাকে তারা ‘যুগান্তকারী’ বলেও উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, যে বিষয়গুলি নিয়ে উদ্বিগ্ন মানুষজন, সেগুলি তাদের এক্তিয়ার বহির্ভূত। স্যাটেলাইট মোতায়েনের লাইসেন্স দেওয়াই কাজ তাদের। রেডিও যোগযোগে বিঘ্ন ঘটতে পারে কি না, পরীক্ষা শেষে মহাকাশযানটিকে নিরাপদে ধ্বংস করা যাবে কি না, সেগুলিই শুধুমাত্র দেখে তারা।
মহাকাশ নিয়েও ব্যবসায়িক স্বার্থকেই কি প্রাধান্য?
Refclect Orbital-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা বেন নাওয়াক জানিয়েছেন, তিনি FCC-র কাছে কৃতজ্ঞ। তবে FCC-র অনুমোদন ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সংস্থার চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কারকে নিয়ে বিতর্ক বরাবরই। তিনি মহাকাশ শিল্পকে সমর্থন করে এসেছেন বরাবর। মহাকাশ নির্ভর ইন্টারনেট পরিষেবার জন্য ইলন মাস্কের SpaceX এবং জেফ বেজোসের Amazon-এর হাজার হাজার স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণেও অনুমতি দেন তিনি। বেশ কিছু বিধিনিয়মও শিথিল করেছেন। তবে পরিবেশের কথা না ভেবে তিনি ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দেন বলে অভিযোগ। কারণ মহাকাশে আয়না বসানো নিয়ে মার্চ মাসে বেন জানান, মহাকাশে বসানো আয়না থেকে আলো পেতে কেউ যদি তাঁদের সঙ্গে বার্ষিক ১০০০ ঘণ্টার চুক্তি করেন, সেক্ষেত্রে প্রতি ঘণ্টায় ৫০০০ ডলার ফি নেবে তাঁর সংস্থা। কোনও অনুষ্ঠান বা জরুরি প্রয়োজনে আলো সরবরাহে আরও বেশি টাকা লাগবে। কারণ একাধিক কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবহার করতে হবে সেক্ষেত্রে, বাড়তি সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে অতিরিক্ত সময় আলো দিলে যে বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে, তা থেকে আয় ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন বেন। তাঁর যুক্তি, সৌরবিদ্যুতের জোগান বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো কমবে। ঠেকানো যাবে জলবায়ু পরিবর্তনকে। এখন সূর্যাস্তের পর সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। তাঁদের প্রযুক্তিতে সেসবের কোনও সমস্যা থাকবে না। নির্মাণকার্য দ্রুত সম্পন্ন হবে, রাতের বেলাও নিরাপদে কাজ করা যাবে, আরও বেশি ফসল উৎপন্ন করতে পারবেন কৃষকরা।
রাশিয়া আগেই করে দেখিয়েছিল, কিন্তু…
তবে মহাকাশে আয়না বসানোর পরিকল্পনা এই প্রথম নয়। ১৯৯৩ সালে ৮০ ফুটের একটি আয়না মহাকাশে পাঠায় রাশিয়া। মেরু অঞ্চলে অবস্থিত সাইবেরিয়ায় দিনের আলোর বেশি সময় ধরে রাখতে ওই পরীক্ষা চালানো হয়। সেবার ওই আয়না পৃথিবীর উপর সূর্যালোকের সরু একটি রশ্মি প্রতিফলিত করেছিল। পরিকল্পনা মতো কাজ এগোয়নি বলে এক দশকেরও কমসময়ের মধ্যে ওই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায় রাশিয়া। এবার আমেরিকা সেই লক্ষ্যে এগোচ্ছে।
