সন্দীপ সরকার, কলকাতা: ঝড় যে উঠতে পারে, সেই ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিল এবিপি লাইভ বাংলা। কিন্তু সেটা যে এরকম তোলপাড় ফেলে দেবে, বাংলার ক্রিকেট প্রশাসনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িতরাও আঁচ করতে পারেননি।
বহু বছর পর সিএবি-র কোনও বৈঠক ঘিরে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হল। দুই পক্ষের মতানৈক্য, বাদানুবাদ পর্যন্ত তবু ঠিক ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এমনই হয় যে, কারও কারও আশঙ্কা, বড়সড় কাণ্ড ঘটে যেতে পারত ইডেন গার্ডেন্সে!
উপলক্ষ্য, সিএবি-র এমার্জেন্ট জেনারেল মিটিং। যুগ্মসচিব পদে কেন নির্বাচন হল না, তা সদস্য়দের জানাতে বুধবার যে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছিল সিএবি-তে। ডেকেছিলেন সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। বিরোধী শিবিরের প্রশ্ন ছিল মূলত তিনটি। বয়স ৭০ বছর হয়ে গেলে, বা ক্রিকেট প্রশাসনে ৯ বছর কাটিয়ে ফেললে, কিংবা সরকারি পদে থাকলে কেউ সিএবি-র বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন কি না। দাবি ছিল, সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত লোঢা কমিটির আইনে এই তিন মাপকাঠিতেই প্রতিনিধিত্ব বাতিল করার কথা বলা রয়েছে। যদিও সৌরভ শিবিরের পাল্টা বক্তব্য ছিল, লোঢা আইন শুধু পদাধিকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ক্লাব, জেলা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে নয়। এ নিয়েই বুধবার বিকেলের বৈঠকে আলোচনা চলছিল।
তবে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে খানিক পরেই। বৈঠকে সিএবি-র ১৪৮ জন অনুমোদিত ভোটারের মধ্যে একশো জনেরও বেশি হাজির ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত অনেকের সঙ্গেই কথা বলে জানা গেল, প্রাক্তন সিএবি প্রেসিডেন্ট অভিষেক ডালমিয়া ও প্রাক্তন সচিব নরেশ ওঝার মধ্যে লোধা আইনে কারা যোগ্য, কারা অযোগ্য, তা নিয়ে যুক্তি-পাল্টা যুক্তির একটা পর্ব চলছিল। সেই সময় টালিগঞ্জ অগ্রগামী ক্লাবের প্রতিনিধি শুভঙ্কর ঘোষ দস্তিদার, ময়দানে যিনি অভিষেক-ঘনিষ্ঠ হিসাবেই পরিচিত, তিনি কিছু একটা বলতে যান। শোনা গেল, সেই সময়ই সিএবি-র ভাইস প্রেসিডেন্ট নীতীশরঞ্জন দত্ত টেবিল চাপড়ে প্রতিবাদ করেন। তাতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বৈঠকে ছিলেন, এরকম একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শুভঙ্কর নীতীশরঞ্জনকে পাল্টা মনে করিয়ে দেন যে, কোনও সদস্যের সঙ্গে তিনি এভাবে কথা বলতে পারেন না। ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েও তিনি পদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছেন এবং একাধিক পরিচয়পত্র ব্যবহার করেন বলেও নীতীশরঞ্জনকে কটাক্ষ করেন শুভঙ্কর। দু’পক্ষের চিৎকারে বৈঠক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কেউ কেউ এমনও বললেন যে, সিএবি-র কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাস মধ্যস্থতা না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারত। সৌরভও নাকি বলেন যে, অভিষেক সিএবির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর সঙ্গে এভাবে কথা বলা অনুচিত।
এ তো গেল এক দফা। এরপর সিএবি-র প্রাক্তন পদাধিকারী, কাউন্সিলর বিশ্বরূপ দে-র সঙ্গে অভিষেকের উত্তপ্ত বাদানুবাদ হয় বলে খবর। লোঢা আইন মানা হলে ক্রিকেট প্রশাসনে ৯ বছর কাটিয়ে ফেলা বিশ্বরূপের সিএবি-তে ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করাও আটকে যেতে পারে বলে বিরোধী শিবির থেকে বলা হচ্ছিল। পাল্টা যুক্তি দেন বিশ্বরূপও।
এরপর সিএবি সচিব বাবলু কোলের সঙ্গেও অভিষেকের ঠোকাঠুকি লাগে। শোনা গেল, প্রাক্তন সিএবি প্রেসিডেন্ট, সিটি অ্যাথলেটিক ক্লাব থেকে বৈঠকে হাজির স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায় কিছু বলার চেষ্টা করলেও শুরুতে তাঁকে নিষেধ করেন ভাই সৌরভ। পরে বলতে বলা হলেও স্নেহাশিস আর বক্তব্য রাখেননি।
বৈঠকে ইলেক্টোরাল অফিসার সুশান্ত রঞ্জন উপাধ্যায় কেন ছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিরোধীদের দাবি, বৈঠকে যখন নির্বাচন বা ভোটাভুটি হচ্ছে না, নির্বাচনী আধিকারিক কেন থাকবেন? যদিও সৌরভ শিবির থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন কেন হয়নি সেটা ব্যাখ্যা করার বৈঠকে নির্বাচনী আধিকারিকের থাকা অন্যায় নয়। বৈঠকে রাজ্যের ক্রীড়া দফতরের এক প্রতিনিধিও ছিলেন।
জানা গেল, সৌরভ বৈঠকের শেষে বলেন, লোঢা আইন কাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আর কাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে আদালতে যেতে পারে বিরোধী শিবির। মোটামুটিভাবে ঠিক হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসে সিএবি-র বার্ষিক সাধারণ সভার সময়ই সচিব (যেহেতু বাবলু কোলের বয়স ৭০ সম্পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে) ও যুগ্মসচিব পদে নির্বাচন হবে। পূরণ করা হবে অ্যাপেক্স কাউন্সিলের শূন্যপদও।
বিরোধী শিবির থেকে বলা হল, এটা তাঁদেরই নৈতিক জয়। বলা হচ্ছে, শাসক শিবির নিজেরাই নির্বাচন ঘোষণা করে কোনও প্রার্থীই দিতে পারল না। শাসক শিবির পাল্টা বলছে, কোনও পক্ষই তৈরি ছিল না বলে নির্বাচন হয়নি। সব মিলিয়ে তোলপাড় চলছে বঙ্গ ক্রিকেটে।
আর ময়দানের ক্রিকেটপ্রেমীরা প্রশ্ন তুলছেন, এত কিছু প্রশাসনিক কচকচানির মধ্যে খেলাটা নিয়ে চিন্তাভাবনা কোথায়? বাংলা যেন কত বছর রঞ্জি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হয়নি?
আরও পড়ুন: মারাদোনার বিশ্বরেকর্ড আজই ভেঙে দিতে পারেন মেসি, এই কীর্তি আর কারও নেই
